রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক চেষ্টা ভারতের
অনলাইন ডেস্ক: সুদীর্ঘ সময় ধরে চলা বিধ্বংসী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতি ও বিশ্ববাজারকে বিপর্যস্ত করে চলেছে। এর মধ্যেই যুদ্ধ থামাতে এক অপ্রত্যাশিত অথচ শক্তিশালী কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারত। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা, কৌশলগত কৃষ্ণসাগরে নৌযানের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত ও বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে নয়া দিল্লি।
আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা কিংবা তুরস্ক ও মিসরের পৃথক প্রচেষ্টার মাঝে নয়া দিল্লির এই উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ নজর কেড়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক কিয়েভ সফরকালে ইউক্রেনীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর এই শান্তি রূপরেখা প্রকাশ পায়।
ভারত মূলত একটি ৩ দফা কৌশলগত কাঠামো উপস্থাপন করেছে: ১. উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ এবং সীমান্ত সংলগ্ন জ্বালানি অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে সামরিক হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। ২. কৃষ্ণসাগরের প্রধান বন্দরগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খাদ্যশস্য এবং অপরিশোধিত জ্বালানি পরিবহন সুরক্ষিত ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা। ৩. আন্তর্জাতিক জলসীমায় সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজে যেকোনো ধরনের সশস্ত্র আক্রমণ থেকে উভয় পক্ষকে বিরত রাখা।
ভারতের এই দূরদর্শী পদক্ষেপকে ইউক্রেন অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা নয়া দিল্লির এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে বর্তমানে আলোচনার টেবিলে থাকা চারটি ভিন্ন প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে 'পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর' বলে অভিহিত করেছেন।
তবে মূল চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে মস্কোকে কেন্দ্র করে। রাশিয়া ভারতের এই বন্ধুভাবাপন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নীতিগতভাবে স্বাগত জানালেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো ধরনের অন্তর্বর্তী বা সাময়িক যুদ্ধবিরতি তাদের মূল লক্ষ্য নয়। ক্রেমলিনের মতে, একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক শান্তি চুক্তিই তাদের মূল দাবি। রাশিয়ার সামরিক নীতি নির্ধারকদের আশঙ্কা, এ জাতীয় সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে ইউক্রেন নিজেদের সামরিক বাহিনী পুনর্গঠিত করার এবং নতুন পশ্চিমাদের ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
যুদ্ধক্ষেত্রে মধ্যস্থতার পেছনে ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক হিসেব-নিকাশও অত্যন্ত স্পষ্ট। বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের সংকট ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সম্প্রতি ২০২৬ সালের জন্য ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে। এই বিপুল অর্থনৈতিক অগ্রগতি বজায় রাখতে নয়া দিল্লির জন্য নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য ও বিশ্ববাজারে জ্বালানির স্থিতিশীল মূল্য বজায় রাখা অত্যাবশ্যকীয়।
তাছাড়া, ভারতের কাছে রাশিয়া অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক হলেও, ইউক্রেনীয় হামলার মুখে রাশিয়ার নিজস্ব তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মস্কো এখন ভারত থেকেই উল্টো পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর আংশিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়া দিল্লিকে কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে একটি টেকসই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চালিত করছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, তুরস্কের লক্ষ্য শিপিং রুট থেকে বাণিজ্য শুল্ক অর্জন এবং মিসরের লক্ষ্য খাদ্যশস্যের জোগান ঠিক রাখা—ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি এসবের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও সর্বজনীন। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই সামরিক উপায়ে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থান বজায় রাখায় ভারতের এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সফলতা পাবে, তা নির্ভর করছে মস্কো ও কিয়েভের নীতিনির্ধারকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
সকালবেলা / নুসরাত