ট্রেনের ছাদে যাত্রীকে মারধর ও ছিনতাই:আটক ১
সিরাজগঞ্জে ঢাকামুখী চিলাহাটিগামী দ্রুতগামী ‘নিলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ছাদে এক চাকরিপ্রার্থী যাত্রীকে আকস্মিকভাবে ঘিরে ধরে মারধর করার পর তাঁর কাছে থাকা নগদ টাকা, দামি মুঠোফোন ও হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। তবে ভুক্তভোগী যাত্রীর আত্মচিৎকার এবং পরবর্তীতে স্থানীয় যাত্রী ও সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক সাহসিকতায় ধাওয়া করে সামছুল হক (২৩) নামের এক ছিনতাইকারীকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে এ সময় কৌশলে অপর এক সহযোগী ছিনতাইকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে সিরাজগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে অতিক্রমকালে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনে এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
আটককৃত ছিনতাইকারীর নাম মো. সামছুল হক (২৩)। সে নারায়ণগঞ্জের বদল রেললাইন দক্ষিণ কলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, এই ঘটনার শিকার ভুক্তভোগী তরুণের নাম তানভীর আহমেদ (১৮)। তিনি সুদূর দিনাজেশনের বিরামপুর এলাকার বাসিন্দা আবু বক্কার সিদ্দিকের ছেলে।
ভুক্তভোগী তানভীর আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, তিনি একটি সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শেষে নিজ বাড়ি বিরামপুরে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে ‘নিলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনে আরোহণ করেছিলেন। পথিমধ্যে যমুনা রেলসেতুর ঠিক আগের একটি স্টেশনে ট্রেন থামলে তিনি কিছু খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য ট্রেন থেকে নিচে নামেন। পরবর্তীতে ট্রেন ছেড়ে দিলে অতিরিক্ত ভিড় ও সিট না পাওয়ার কারণে তিনি আর ট্রেনের ভেতরে ঢুকতে না পেরে বাধ্য হয়ে বগির ছাদে গিয়ে ওঠেন। ট্রেনটি যখন যমুনা রেলসেতু পার হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ওত পেতে থাকা দুই ছিনতাইকারী তাঁর ওপর চড়াও হয় এবং মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে তারা তাঁর পকেট থেকে নগদ ২ হাজার ৯০০ টাকা, একটি হাতঘড়ি এবং একটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন জোরপূর্বক কেড়ে নেয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তানভীর আরও বলেন, “আমি তাদের পায়ে ধরে বারবার অনুরোধ করে বলেছিলাম, ‘ভাই আমার টাকাগুলো বা অন্য যা আছে নিয়ে যান, শুধু আমার মুঠোফোন আর ১০০ টাকাটা অন্তত ফেরত দিন; কারণ ওই মুঠোফোনে আমার চাকরির অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ডকুমেন্টস রয়েছে।’ কিন্তু তারা আমার কথায় কর্ণপাত না করে উল্টো শুধু ১০০ টাকা ফেরত দিয়ে বাকি মোবাইল ও অন্য সব মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে নেয়।”
পরবর্তীতে ট্রেনটি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছালে ভুক্তভোগী তানভীর ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে চোর চোর বলে চিৎকার শুরু করেন। তাঁর আর্তনাদ শুনে ট্রেনের অন্যান্য সচেতন যাত্রী এবং স্টেশনে আগে থেকেই উপস্থিত থাকা সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে দৌড়ে এসে অভিযুক্তদের ঘিরে ফেলেন এবং ধাওয়া করে সামছুল হককে ধরে ফেলেন। তবে সুযোগ বুঝে অপর সহযোগী ছিনতাইকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কামারখন্দ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাশমত আলী জানান, “ছিনতাইয়ের অভিযোগে স্থানীয়দের হাতে আটক হওয়া ওই যুবককে প্রথমে কামারখন্দ থানা পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে নিয়মানুযায়ী তাকে জিআরপি বা সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ বাজার রেলওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল ইসলাম তালুকদার জানান, “খবর পাওয়ার পরপরই আমরা কামারখন্দ থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করি এবং তাদের জিম্মায় থাকা অভিযুক্তকে আমাদের হেফাজতে নিয়ে আসি। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী ছেলেটির খোয়া যাওয়া মুঠোফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তা তার জিম্মায় দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। তবে যে আরেকজন পালিয়ে গেছে, যার কাছে বাকি ২৭০০ টাকা ছিল, তাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৭ অক্টোবর দিবাগত রাতে জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনে চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইয়ের একটি অপ্রীতিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। এরপর থেকেই সাধারণ রেলযাত্রীদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওই স্টেশনে নিয়মিত রেলওয়ে পুলিশ ও পর্যাপ্তসংখ্যক আনসার সদস্য মোতায়েন করার জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয় সচেতন মহল। সাম্প্রতিক এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু ইতোমধ্যে দুই রাত ধরে মাঠে বিশেষ মহড়া দিয়েছেন। পাশাপাশি রেলওয়ে পুলিশ ও কামারখন্দ থানা পুলিশ যৌথভাবে ছিনতাইকারীদের পূর্ণাঙ্গ শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।