কূটনৈতিক ধাক্কা: ট্রাম্পের ইরান চুক্তিতে বড় রাজনৈতিক সংকটে নেতানিয়াহু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল সোমবার (১৫ জুন) ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ (G7) সম্মেলনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সময় ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো— জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের দিন, অর্থাৎ আগামী শুক্রবার থেকেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ আন্তর্জাতিক যাতায়াতের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই অপ্রত্যাশিত চুক্তি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমঝোতা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের তিনটি মৌলিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে— যিনি নিজেকে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে প্রভাবশালী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাল? আরও বড় প্রশ্ন হলো— কেন তার প্রধান মিত্রই এমন একটি পদক্ষেপ নিল যা কার্যত তাকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে এবং অস্বস্তিকর অবস্থানে ফেলে দিয়েছে?
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইসরাইলের নিরাপত্তার এক নম্বর হুমকি হিসেবে তুলে ধরে এসেছেন। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এই সংঘাত-পরবর্তী বাস্তবতায় ইরান আগের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের পক্ষ থেকে যে যৌথ চাপ তৈরি হয়েছে, তা নেতানিয়াহুর বহুদিনের গড়ে তোলা ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তির ওপর বড় আঘাত। বিশেষ করে ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এই পরিস্থিতি তার জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিব্রতকর।
নেতানিয়াহুর সামনে এখন কার্যত কোনো সহজ সমাধান নেই। গতকাল সোমবার ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ তীব্র সমালোচনা করে মন্তব্য করেন, “নেতানিয়াহুর সামনে এখন মাত্র দুটি পথ খোলা আছে— হয় আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ও গভীর সংঘাতের আত্মঘাতী পথে জড়ানো, নয়তো ইসরাইলের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া।”
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রকাশ্যে বলেন যে, বৈরুতে হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু বিচক্ষণতার পরিচয় দেননি। ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইসরাইলের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং গণমাধ্যমের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে, যা আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে তারা জোরালোভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
শুধু বিরোধীরাই নয়, নেতানিয়াহুর নিজ দল লিকুদ পার্টি এবং জোট সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের মধ্যেও অসন্তোষ স্পষ্ট। তেহরানের দাবি— যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধ থাকবে; যা ইসরাইলের ডানপন্থী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। আমরা এমন কোনো চুক্তির অংশ নই, যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।”
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, “এই পরিস্থিতি ইসরাইলের ইরান-কেন্দ্রিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তুলেছে। ওয়াশিংটন যদি মনে করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ এই চুক্তিকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা, তবে তার প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর হতে পারে।” ওবামা প্রশাসনের সময় নেতানিয়াহু যেভাবে হোয়াইট হাউসকে পাশ কাটিয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে কাজে লাগাতেন, বর্তমান বাস্তবতায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে সেই পথ সম্পূর্ণ বন্ধ।
ফলে আজ নেতানিয়াহু এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে তাকে কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়, বরং তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামরিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সংঘাত কিংবা আপসের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে।
|