নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় প্রাণ হারানোর আগেই নিজের উত্তরসূরি নির্ধারণ এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রেখে গেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ চার দশক ধরে ইরানের সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই নেতা শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) তেহরানে নিজ কার্যালয়ে হামলায় নিহত হন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির পর ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ খামেনির মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে খামেনির রেখে যাওয়া গোপন ক্ষমতা কাঠামো ও উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় আত্মগোপনে থাকাবস্থায় খামেনি সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরির নাম চূড়ান্ত করেছিলেন। ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, এই তালিকায় রয়েছেন বর্তমান বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই, খামেনির অত্যন্ত বিশ্বস্ত দপ্তরপ্রধান আলী আসগর হেজাজি এবং ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা খোমেনির নাতি ও সংস্কারপন্থি ধর্মীয় নেতা হাসান খোমেনি। যদিও খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির নাম বিভিন্ন মহলে আলোচিত ছিল, তবে খামেনি নিজে নেতৃত্বকে বংশানুক্রমিক করার বিপক্ষে ছিলেন বলে জানা গেছে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ এই তিনজনের মধ্য থেকে বা নতুন কাউকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করবে।
হামলার ঠিক আগমুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে খামেনি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানিকে বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। লারিজানি কার্যত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে পাশ কাটিয়ে বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তেহরানের অতি সুরক্ষিত ‘পাস্তুর কমপ্লেক্স’ লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার বাসভবন, দপ্তর ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। খামেনি তার অবর্তমানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আলী আসগর হেজাজি, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ড প্রধান ইয়াহিয়া রহিম সাফাভির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক বলয় তৈরি করে গেছেন।
বর্তমানে ইরানের নেতৃত্ব কার হাতে রয়েছে তা নিয়ে শনিবার রাত পর্যন্ত ধোঁয়াশা থাকলেও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন, ‘কিছু নেতাকে হারালেও রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো সমস্যা হবে না; আত্মরক্ষায় ইরানের কোনো সীমা নেই।’ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষজ্ঞ পরিষদের জরুরি বৈঠকের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে খামেনির চার দশকের উত্তরাধিকার কে বহন করবেন। তবে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হার্ডলাইন অবস্থান এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বর্তমানে তেহরানের ক্ষমতা কাঠামোতে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও সামরিক প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এম.এম/সকালবেলা