সূর্যের নিখুঁত ছবি তুলল বিশ্বের শক্তিশালী সৌর দুরবিন ইনোউয়ে

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩০ অপরাহ্ণ
সূর্যের নিখুঁত ছবি তুলল বিশ্বের শক্তিশালী সৌর দুরবিন ইনোউয়ে
ইনোউয়ে সৌর দুরবিনে ধরা পড়া সূর্যের নজিরবিহীন সূক্ষ্ম ছবি

অনলাইন ডেস্ক: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দুরবিন ‘ইনোউয়ে সোলার টেলিস্কোপ’ ব্যবহার করে সৌরবিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছেন বিজ্ঞানীরা। সূর্যের অত্যন্ত উত্তপ্ত পৃষ্ঠের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট ও নিখুঁত ছবি এবং ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সূর্যের পৃষ্ঠে তরঙ্গের মতো ঘূর্ণাবর্তের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করলেন গবেষকরা।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সূর্যের ভেতরের চরম উত্তপ্ত প্লাজমা বা গ্যাসের অনবরত চলাচলের কারণে এর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ক্রমাগত মোচড় খেতে থাকে ও ঘুরতে শুরু করে। এই শক্তিশালী ঘূর্ণনের ফলেই সূর্য থেকে প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়, যা মহাকাশে ‘মহাকাশ আবহাওয়া’ (Space Weather) সৃষ্টি করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রবল শক্তিধর এই মহাকাশ আবহাওয়া পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। পাশাপাশি মহাকাশ স্টেশনে বা অভিযানে থাকা নভোচারীদের জীবনের জন্যও এটি তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির (এনএসও) বিজ্ঞানী ডেভিড ববোল্টজ এই বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন, “সূর্যই আমাদের সৌরজগতের সমস্ত শক্তি এবং মহাকাশ আবহাওয়ার মূল উৎস। তাই সূর্যকে আরও সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে মহাকাশ আবহাওয়ার প্রভাব সম্পর্কে আগাম এবং সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সহজতর হবে।” তিনি আরও জানান, সূর্যের ক্ষুদ্রতম স্তরের কার্যপ্রণালী বুঝতে পারলেই তবেই মহাকাশ আবহাওয়া সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবেলা সম্ভব।

বিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী অর্জনটি সম্ভব হয়েছে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের এক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত ‘ইনোউয়ে সোলার টেলিস্কোপ’-এর (Inouye Solar Telescope) কল্যাণে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে ধূলিমুক্ত ও সম্পূর্ণ পরিষ্কার আকাশ থাকার কারণে এই দুরবিনটি সূর্যের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছবি তোলার সক্ষমতা রাখে। এবার এই টেলিস্কোপ দিয়ে জুম করে সূর্যের পৃষ্ঠের ওপর চলমান ছোট ছোট আবর্তের স্পষ্ট চিত্র ধরে রাখা হয়েছে।

এনএসও-র জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. ডেভিড কুরিডজে বিবিসি নিউজকে বলেন, “সূর্যের ওপরের এসব ঘূর্ণায়মান গতির ফলেই মূলত মারাত্মক চৌম্বকীয় শক্তি তৈরি হয়। পরবর্তীতে বিপুল পরিমাণ এই শক্তি জমা হতে হতে একপর্যায়ে বড় ধরনের সৌর বিস্ফোরণের রূপ নেয়।”

গবেষকরা সূর্যের পৃষ্ঠে যে বিশেষ ভৌতিক ঘটনাটি এবার সরাসরি শনাক্ত করেছেন, বিজ্ঞানের ভাষায় সেটিকে বলা হয় ‘কেলভিন-হেলমহোল্টজ ইনিসস্ট্যাবিলিটি’ (Kelvin-Helmholtz Instability)। সাধারণত দুটি ভিন্ন ঘনত্বের ও ভিন্ন গতির উত্তপ্ত গ্যাসের স্তর যখন একে অপরের পাশ দিয়ে দ্রুত প্রবাহিত হয়, তখন ক্ষুদ্র আলোড়ন থেকে ধীরে ধীরে শক্তিশালী ঘূর্ণায়মান আবর্ত তৈরি হয়—যা সাগরের বুকে ছোট ঢেউকে বিশাল তরঙ্গে পরিণত করার প্রক্রিয়ার মতোই কাজ করে।

সংস্থার অপর গবেষক ড. ফ্রেডরিখ ওয়েগার মন্তব্য করেন, সূর্যের পৃষ্ঠে এই প্রক্রিয়ার সন্ধান মেলায় শুধু মহাকাশ আবহাওয়া তৈরির রহস্যই সমাধান হবে না, বরং সূর্যের মূল পৃষ্ঠের চেয়ে এর বাইরের বায়ুমণ্ডলীয় স্তর (করোনা) কেন এত অবিশ্বাস্য রকমের উত্তপ্ত—সেই চিরন্তন প্রশ্নেরও গাণিতিক ব্যাখ্যা মিলবে।

তিনি জানান, সূর্যের ভেতরের জমানো শক্তি কীভাবে ধাপে ধাপে ওপরের স্তরে পৌঁছে যায়, তা এই ছবির মাধ্যমে পরিষ্কার বোঝা যায়। এই সঞ্চিত শক্তি সীমা অতিক্রম করলে তা সোলার ফ্লেয়ার বা করোনাল মাস ইজেকশন আকারে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানীরা স্মরণে করিয়ে দেন যে, সূর্য মানবজাতির কাছে শুধু একটি শক্তির উৎস নয়, এটি পুরো মহাবিশ্বের পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মগুলো পরীক্ষা করার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গবেষণাগার। ইতিপূর্বে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইন্সটাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রথম পরীক্ষামূলক বাস্তব প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। ফলে মহাবিশ্ব ও নক্ষত্রের আচরণ বুঝতে এ ধরনের শক্তিশালী দুরবিনের পর্যবেক্ষণ মানবজাতির জ্ঞানকে আরও বহুদূর এগিয়ে নেবে।

মন্তব্য করুন