চীনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখানো হবে অদম্য আয়েশার প্রামাণ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’

প্রকাশ: সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০২:১৭ অপরাহ্ণ
চীনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখানো হবে অদম্য আয়েশার প্রামাণ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’

বিনোদন প্রতিবেদক : জন্ম থেকেই যার দুটি হাত নেই, চারপাশের সমাজ ও আত্মীয়রা যাকে সারাজীবন অবহেলা করেছে এবং তীব্র অভাবের তাড়নায় নিজের বাবাও একসময় যাকে সার্কাসে বিক্রি করে দেওয়ার মতো চরম নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—সেই আয়েশা আক্তার আজ বাংলাদেশের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য ও জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। সমস্ত শারীরিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, নিজের পা দিয়ে লিখে সদ্য মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ (ফার্স্ট ক্লাস) অর্জন করেছেন গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের এই সাহসী তরুণী। আয়েশার এই দীর্ঘ এক যুগের অবিশ্বাস্য লড়াই, চোখের জল আর রূপকথার মতো সাফল্যের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্য তথ্যচিত্র বা বায়োডক (Biodoc) ‘পায়ের ছাপ’। এবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আয়েশার এই অনন্য অনুপ্রেরণামূলক গল্প বিশ্বমঞ্চে, বিশেষ করে চীনের তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জীবন গঠনে আলো ছড়াতে যাচ্ছে।

শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের সম্মানিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের মূল প্রযোজনায় এবং চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মোস্তফা মল্লিকের নিখুঁত পরিকল্পনা ও পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে ২৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের এই বিশেষ প্রামাণ্যচিত্রটি। গত ১৭ মে রাত ১০টা ২০ মিনিটে চ্যানেল আইয়ের পর্দায় এটি প্রথম প্রচারিত হওয়ার পর দেশজুড়ে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সমাজকে এক দারুণ বার্তা দেওয়া এই ডকুমেন্টারিটি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড থেকেও আনুষ্ঠানিক ও বিনাশর্তে অনুমোদন লাভ করেছে।

বাংলাদেশের এই অনন্য গৌরবগাথার সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে যুক্ত হয়েছেন চীনের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশপ্রেমী লিউ জিই (Liu Jiyi)। তিনি আয়েশার জীবনসংগ্রামে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতিমধ্যেই নিজস্ব উদ্যোগে ‘পায়ের ছাপ’-এর সম্পূর্ণ চীনা ভাষার ডাবিং ও অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন। প্রখ্যাত এই চীনা ব্যক্তিত্ব আয়েশার এই কঠিন জীবনযুদ্ধকে চীনের ৮০-র দশকের একজন উচ্চপর্যায়ের পক্ষাঘাতগ্রস্ত (শারীরিক প্রতিবন্ধী) এবং সে দেশের জাতীয় কিংবদন্তি নারী ‘ঝাং হাইদি’-র (Zhang Haidi) সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার জীবনকাহিনী চীনের ঘরে ঘরে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত।

লিউ জিই এবং তাঁর সহযোগী জু দি (Xu Di) জানিয়েছেন, আগামী মাসেই চীনের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘সাউথ চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটি’ (South China Normal University) এবং ‘সাউথ চায়না অ্যাগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি’র (South China Agriculture University) ক্যাম্পাসে এই তথ্যচিত্রটির বিশেষ প্রদর্শনীর চূড়ান্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় দুটির গণযোগাযোগ ও চলচ্চিত্র বিভাগের অধ্যাপকেরা জানিয়েছেন, আয়েশার এই অবিস্মরণীয় কাহিনী বর্তমানে চীনের বুদ্ধিজীবী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও উচ্চমহলে অত্যন্ত গুরুত্ব এবং সম্মানের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি চীনের আরও তিনটি শীর্ষস্থানীয় হাইস্কুলেও আয়েশার এই প্রামাণ্যচিত্রটি দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে চীনের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জীবনের কঠিন সময়ে হতাশ না হয়ে আয়েশার মতো লড়াই করতে শেখে।

তথ্যচিত্রটিতে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে আয়েশার শৈশবের সেই নির্মম দিনগুলো, যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্কুলে ভর্তি নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন স্থানীয় একজন শিক্ষক সমাজ ও প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে আয়েশাকে নিজের স্কুলে টেনে নেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে এইচএসসি পাসের পর আয়েশার জীবন নাটকীয়ভাবে বদলে যায় চ্যানেল আইয়ের পর্দায় প্রচারিত নির্মাতা মোস্তফা মল্লিকের একটি বিশেষ অনুসন্ধানী রিপোর্টের মাধ্যমে। মোস্তফা মল্লিকের হাত ধরেই আয়েশা প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে ‘কিংবদন্তি অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন এবং এককালীন ২ লাখ টাকা অনুদান পান, যা দিয়ে তিনি তাঁদের ভাঙা ছোট টিনের ঘরটি পাকা করেন। এরপর একজন ফ্রান্সপ্রবাসী সহৃদয় ব্যবসায়ীর নিয়মিত আর্থিক সহায়তায় তিনি তাঁর উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান এবং ২০২৫ সালে মাস্টার্সে প্রথম বিভাগ অর্জনের গৌরব অর্জন করেন।

আয়েশার এই অভূতপূর্ব সাফল্যে বুয়েটের অধ্যাপক এ বি এম হারুন উর রশীদ, সাউথ অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মাহফুজুল আজিজ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল্লাহ্ আল মামুন আয়েশাকে পুরো বাঙালি জাতির জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও কৃষি উন্নয়ন অনুরাগী শাইখ সিরাজ বলেন, “শহরের সব রকম আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও গৃহশিক্ষক পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া আর প্রত্যন্ত গ্রামের হাতহীন আয়েশার পা দিয়ে লিখে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার মধ্যের তফাত আকাশ-পাতাল। সে মূলত বর্তমান সমাজের বহু হতাশ তরুণ-তরুণীর জন্য এক অনন্য ‘আই-ওপেনার’ বা চোখ খুলে দেওয়ার মতো উদাহরণ।”

মাস্টার্স শেষ করে আয়েশা বর্তমানে নিজের ঘরে বসে চাকরির জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং একই সাথে নিজের গ্রামের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াচ্ছেন। তবে অত্যন্ত অভাবের সংসার হওয়ায় নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং একটি স্থায়ী সরকারি বা বেসরকারি চাকরির আকুতি তাঁর এখনো মেটেনি। তথ্যচিত্রটি প্রচারের পর আয়েশার এই মানবিক আবেদনে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর এক বিশেষ ঘোষণায় জানিয়েছেন, যতদিন না আয়েশার একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক চাকরি হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত চ্যানেল আইয়ের পক্ষ থেকে আয়েশাকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে নিয়মিত সম্মানী বা জীবনধারণের বিশেষ বিশেষ সম্মানী ভাতা প্রদান করা হবে।

পরিচালক মোস্তফা মল্লিক অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমি আয়েশাকে এবং তাঁর পরিবারকে খুব কাছ থেকে ফলো করেছি, তাঁর প্রতিটি স্ট্রাগল ও চোখের জল আমি দেখেছি। চ্যানেল আই আমাকে এই অসাধারণ বায়োডকটি তৈরি করার জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা ও সুযোগ দিয়েছে। আয়েশা মূলত বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করেছে যে, জীবনকে জয় করতে বা সফল হতে দুটি সুস্থ হাত লাগে না, কেবল মনের অটল ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।” এই বিশেষ প্রামাণ্য তথ্যচিত্র নির্মাণে অন্যতম প্রধান করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স এবং মালিশাএডু।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন