মহানবীর (সা.) মুচকি হাসি আমাদের যে শিক্ষা দেয়

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০২:২৭ অপরাহ্ণ
মহানবীর (সা.) মুচকি হাসি আমাদের যে শিক্ষা দেয়

ধর্ম ডেস্ক:মানবজাতির হেদায়েত ও সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য পবিত্র ইসলামে প্রতিটি ছোট-বড় মানবিক গুণাবলিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের মুখের এক চিলতে মিষ্টি হাসি। ঠোঁটের কোণের এই মৃদু বাঁকা রেখা কেবল নিজের মনকেই প্রফুল্ল করে না, বরং চারপাশের মানুষের বুকেও আনন্দের দোলা দিয়ে যায়। আর এই গুণটির সবচেয়ে বড় ও জীবন্ত প্রতীক ছিলেন স্বয়ং আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুর ১২টা ১২ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইসলামিক সুন্নাহ, হাদিস একাডেমি ও সীরাত খতিয়ান’ এবং ‘আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, মানসিক স্বাস্থ্য ও হিউম্যান বিহেভিয়ার উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে মহানবীর (সা.) মুচকি হাসির শিক্ষা ও তার সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাবের বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হলো।

ইসলামের বিভিন্ন ইতিহাস ও হাদিসের পাতায় পাতায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোমল আচরণ ও হাসিমুখের কথা বারবার উঠে এসেছে। আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা.) বর্ণনা করেছেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি আর কাউকে সবসময় হাসিমুখে থাকতে দেখিনি।” শুধু তাই নয়, মহানবী (সা.) নিজের কোনো মুসলিম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে কথা বলাকেও ‘সদকা’ বা ঐচ্ছিক দান হিসেবে গণ্য করতেন (তিরমিজি, ৩৬৪১)।

হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, “আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাকে কখনো তাঁর দরবারে আসার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানাননি। আর যখনই তিনি আমার দিকে তাকাতেন, তাঁর পবিত্র মুখে একটি মিষ্টি ও পরম স্নেহের হাসি ফুটে উঠত” (মুসলিম, ৬০৫০)। এমনকি সাহাবিরা যখন রাসুলুল্লাহর সাথে বসে জাহেলি যুগের বিভিন্ন মজার ঘটনা নিয়ে হাসাহাসি করতেন, তখনও তিনি তাদের ধমক না দিয়ে নিজে মৃদু মুচকি হাসতেন (মুসলিম, ১৪১১)।

হজরত আনাস (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কাটানো ১০ বছরের স্মৃতির কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি কখনো কোনো অশোভন শব্দ উচ্চারণ করেননি এবং কারও সাথে কখনো রুঢ় আচরণ করেননি। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে একটি কাজের নির্দেশ দিলে তিনি শিশুদের সাথে খেলায় মত্ত হয়ে যান। তখন রাসুল (সা.) পেছন থেকে এসে তাঁর ঘাড় আলতো করে চেপে ধরেন এবং আনাস (রা.) যখন ফিরে তাকান, দেখেন প্রিয় নবী পরম স্নেহে মুচকি হাসছেন (আবু দাউদ, ৪৭৫৫)। তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, মহানবীর চরিত্র ছিল স্বয়ং পবিত্র কোরআন।

ধর্মীয় সওয়াবের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও আজ হাসির চমৎকার কিছু স্বাস্থ্যগত দিক আবিষ্কার করেছে। বিজ্ঞান বলছে, মানুষ যখন হাসে, তখন শরীরে ‘এন্ডোরফিন’ (Endorphin) নামক এক বিশেষ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মানসিক চাপ বা স্ট্রেস দ্রুত কমিয়ে মনকে সতেজ করে তোলে। এই হরমোন প্রাকৃতিক পেইনকিলার হিসেবে শরীরের বিভিন্ন ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হাসিখুশি থাকার অভ্যাস মানুষের হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখে, সাময়িকভাবে উচ্চ রক্তচাপ কমায় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (Immune System) অনেক বেশি সক্রিয় করে তোলে। ফলে শরীর যেকোনো রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতে পারে। কর্মক্ষেত্রে হাসিখুশি থাকলে কাজের উৎপাদনশীলতা বা প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে। এমনকি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত হাসার অভ্যাস মানুষের গড় আয়ু প্রায় সাত বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।

ইসলাম যেহেতু একটি মধ্যপন্থার ধর্ম, তাই পরিবার বা বন্ধুদের সাথে কৌতুক বা হাসাহাসি করার ক্ষেত্রেও এতে সুনির্দিষ্ট পরিমিতিবোধ ও শালীনতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) নিজে সাহাবিদের সাথে আনন্দ-কৌতুক করতেন এবং ভালোবাসার সুন্দর সুন্দর ডাকনামও দিতেন, কিন্তু তাঁর প্রতিটি রসিকতার পেছনে থাকত উচ্চ নৈতিক আদর্শ। তিনি কখনো কাউকে মনে কষ্ট দিয়ে কিংবা মিথ্যা বলে কৌতুক করতেন না।

মিথ্যা হাসির ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “দুর্ভোগ সেই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে কথা বলে এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস” (তিরমিজি, ২৩১৫)। তাই অনর্থক অশালীন হাসাহাসি বর্জন করে প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে রাসুল (সা.)-এর এই সুন্দর ও কল্যাণকর মুচকি হাসির সুন্নতকে ধারণ করাই হোক আমাদের সবার লক্ষ্য।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন