হিল্লা বিয়ে বা হালালা নিয়ে ইসলামের বিধান ও শরয়ী
নিজস্ব ডেস্ক:সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘হালালা সেন্টার’ নামে একটি কথিত ও ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের হিল্লা বিয়ের চটকদার বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন শত শত সাধারণ মানুষ। ধর্মীয় সরলতাকে পুঁজি করে খোলা ওই পেজে বিয়ের উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবনবৃত্তান্ত বা বায়োডাটা পাঠিয়েছিলেন অনেকে। তবে কোনো বিয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে, কয়েকদিন পর কুচক্রী মহলটি ওইসব মানুষের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ও আইডেন্টিটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে দেয়। এতে ভুক্তভোগীরা সামাজিকভাবে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং মারাত্মক ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সাইবার স্ক্যামের রেশ ধরে ইসলামে ‘হিল্লা বিয়ে’র প্রকৃত রূপরেখা ও বিধান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
আজ শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘শরীয়ত বিশ্লেষণ, ফতোয়া ও সমসাময়িক মাসআলা খতিয়ান’ এবং ‘ইসলামী ফিকাহ, মুসলিম পারসোনাল ল ট্র্যাকিং ও আইনি রূপরেখা উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে হিল্লা বিয়ের শরয়ী অবস্থান ও প্রায়োগিক খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
ইসলামি শরীয়তের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দম্পতির মধ্যে যদি চূড়ান্ত ‘তিন তালাক’ সংঘটিত হয়ে যায়, তবে ওই নারী তাঁর প্রথম স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ অবৈধ বা হারাম হয়ে যান। এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের বিধান হলো, যতক্ষণ না ওই নারী স্বাভাবিক নিয়মে অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন এবং সেই নতুন স্বামী তাকে স্বাভাবিকভাবে তালাক দিচ্ছেন বা নতুন স্বামীর মৃত্যু হচ্ছে—ততক্ষণ পর্যন্ত প্রথম স্বামীর সাথে ওই নারীর পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।
তবে আমাদের সমাজ বাস্তবতায় এক ধরণের কৃত্রিম ও চুক্তিভিত্তিক ‘হিল্লা বিয়ে’র প্রচলন দেখা যায়। যেখানে প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রীলোকটিকে তড়িঘড়ি হালাল করার অসৎ উদ্দেশ্যে একজন নামমাত্র পুরুষের সাথে নির্দিষ্ট শর্তে (যেমন: এক রাত সংসার করে পরদিন তালাক দিয়ে দেবে) ওই নারীর বিয়ে দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ওই পুরুষ এক রাত কাটানোর পর পরদিন তাকে তালাক দিয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে প্রথম স্বামী পুনরায় তাকে বিয়ে করে।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তালিমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও প্রখ্যাত মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী এই প্রশ্নের স্পষ্ট খতিয়ান দিয়ে জানিয়েছেন, ইসলামে এই ধরণের চুক্তিভিত্তিক বা পূর্বপরিকল্পিত হিল্লা বিয়ে করা সম্পূর্ণ ‘হারাম’ ও নিষিদ্ধ। যারা এই ধরণের হিল্লা বিয়ে চুক্তির মাধ্যমে সম্পাদন করে এবং যার স্বার্থে (প্রথম স্বামী) এটি করা হয়, তাদের উভয়ের ওপরেই মহান আল্লাহ তাআলার তীব্র লানত বা অভিশাপ বর্ষিত হয়।
হাদিস শরীফের বিশুদ্ধ খতিয়ান উল্লেখ করে তিনি জানান, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— “হালালকারী (যে পুরুষ হিল্লা বিয়ে করল), যার জন্য হালাল করা হলো (প্রথম স্বামী) এবং যাকে হালাল করা হলো (উক্ত নারী), তাদের সবার ওপর আল্লাহর অভিশাপ।” (مصنف ابن أبي شيبة : ১৭৩৬৪)। সুতরাং, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই লৌকিক ও লোকদেখানো চুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এখানে ফিকাহ শাস্ত্রের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আইনি মারপ্যাঁচ রয়েছে, যা মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, “কোনো একটি প্রক্রিয়া বা কাজ ধর্মীয়ভাবে ‘হারাম’ হওয়া মানেই এই নয় যে, ওই হারাম কাজের মাধ্যমে সংঘটিত মূল বৈষয়িক বা আইনি বিষয়টি সম্পন্ন হয়নি। উদাহরণস্বরূপ—কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা মারাত্মক হারাম ও কবিরা গুনাহ, কিন্তু কেউ যদি কাউকে গুলি করে হত্যা করে, তবে কি সেই মানুষটি বেঁচে থাকবে? অবশ্যই সে মারা যাবে এবং কাজটিকে ব্যবচ্ছেদ অনুযায়ী ‘হত্যা’ বলা হবে। ঠিক একইভাবে, জেনা বা ব্যভিচার করা চরম হারাম, কিন্তু কেউ জেনায় লিপ্ত হলে সেখানে জেনা সংঘটিত হয়েছে বলেই গণ্য করা হয়।”
এই বৈজ্ঞানিক নিয়মের ওপর ভিত্তি করে ফিকাহবিদদের অভিমত হলো, চুক্তিভিত্তিক এই হিল্লা বিয়ের প্রক্রিয়াটি যদিও চরম গুনাহ এবং অভিশাপযোগ্য কাজ, তবুও যদি কেউ এই পদ্ধতি অবলম্বন করে বিয়ে এবং শারীরিক সম্পর্ক সম্পন্ন করার পর তালাক দেয়, তবে ওই স্ত্রীলোকটি শর্তহীনভাবে তাঁর প্রথম স্বামীর জন্য পুনরায় বিয়ের জন্য আইনিভাবে হালাল বা জায়েজ হয়ে যায়।
এর প্রমাণ স্বয়ং উক্ত হাদিসের শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে। হাদিসে এই হিল্লাকারী পুরুষটিকে ‘হালালকারী’ (المُحلِّل) বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যদি এই কাজের দ্বারা ওই নারী প্রথম স্বামীর জন্য আসলেই হালাল নাই হতো, তবে আল্লাহর রাসুল (সা.) ওই পুরুষকে ‘হালালকারী’ বলতেন না। একইভাবে স্ত্রীলোকটিকে হাদিসে ‘হালালকৃত’ এবং প্রথম স্বামীকে ‘যার জন্য হালাল করা হয়’ বলা হয়েছে। যা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কাজটি চরম নিন্দনীয়, গুনাহের এবং বর্জনীয় হলেও এর মাধ্যমে আইনি কন্ডিশন বা প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যায় এবং প্রথম স্বামী নতুন মোহরানা ও আকদের মাধ্যমে ওই নারীকে পুনরায় ঘরে তুলতে পারেন। তবে মুসলিম উম্মাহর উচিত এই ধরণের অভিশপ্ত ও কৃত্রিম চুক্তির আশ্রয় না নিয়ে ইসলামের মূল সুন্দর ও স্বাভাবিক নিয়মগুলো মেনে চলা এবং সাইবার দুনিয়ার ভুঁইফোড় ‘হালালা সেন্টার’ বা প্রতারকদের ফাঁদ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা।
জান্নাত সকালবেলা
|