এক হাতে জীবনযুদ্ধ: অদম্য সেলিনার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
মোস্তাফিজুর রহমান (কয়রা, খুলনা): শরীরের এক হাত নেই, হৃদয়ে নেই কোনো অভিযোগ। পাওয়ার খাতায় সুখ আর স্বপ্নের গল্প লেখার বয়সে সেলিনা খাতুন লড়ে চলেছেন এক কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। অভাব, নির্যাতন আর স্বামী হারানোর অবর্ণনীয় যন্ত্রণা পেরিয়ে তিনি আজ নিজেই নিজের সংসারের হাল ধরেছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঝুড়িতে পান বিক্রি করে এক হাতেই জীবনের জয়গান গেয়ে চলেছেন খুলনার কয়রা উপজেলার অদম্য নারী সেলিনা খাতুন।
খুলনার কয়রা উপজেলা সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ৪ নম্বর কয়রা গ্রামের ইসমাঈল গাজীর মেয়ে সেলিনা খাতুন (৩৬)। ২০১২ সালে পরিবারের পছন্দে সংসার শুরু করেছিলেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী মোখসেদপুর গ্রামে। ভেবেছিলেন নতুন ঠিকানায় সুখের আলো ফুটবে। কিন্তু ২০১৭ সালে তাঁর জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। বাম হাতে পচন ধরায় চিকিৎসকদের পরামর্শে কনুই থেকে কেটে ফেলতে হয় হাতটি।
সেই শারীরিক ক্ষতের ব্যথা না শুকাতেই নিয়তি তাঁর ওপর আরও বড় আঘাত হানে। হাত কাটার মাত্র দুই বছরের মাথায়, ২০১৯ সালে অসুস্থ হয়ে মারা যান তাঁর স্বামী। রেখে যান মাত্র ছয় বছরের এক শিশুসন্তান আলী হোসেনকে। স্বামী হারানোর পর শুরু হয় সেলিনার চরম সংগ্রাম। পদে পদে অবহেলা আর অভাবের কষাঘাত সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কোলের সন্তানকে আঁকড়ে ধরে ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমি বাপের ভিটায়।
বাবার বাড়ি ফিরে জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন রূপ নেয়। ভাঙা ঘরে ছোট সন্তানকে নিয়ে দু-মুঠো ভাতের সংস্থান করতে গিয়ে আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। কখনো মানুষের কাছে হাত পেতে, কখনো অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি করে কোনোমতো চালিয়েছেন সন্তানের পড়ালেখা ও সংসার।
কিন্তু অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকা মেনে নেননি এই সংগ্রামী নারী। ২০২০ সালে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ভগ্নিপতির সহযোগিতায় মাত্র ৫০০ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন পানের ব্যবসা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সেই থেকে ঝুড়িতে পান সাজিয়ে, কাঁধে বা মাথায় করে গ্রামের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে পান বিক্রি শুরু করেন সেলিনা।
সম্প্রতি মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে কয়রা উপজেলার সুতির অফিস বাজারে গেলে চোখে পড়ে এক অনুপম দৃশ্য। বাজারের কোলাহলে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মাঝে পানের ঝুড়ি আর বড় এক পাত্র জিলাপি নিয়ে বসে আছেন সেলিনা। কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে জানা গেল, ফুটপাতে বসা তাঁর এই অস্থায়ী পানের দোকানে চলছে স্থানীয়দের অংশগ্রহণে ঐতিহ্যবাহী ‘হালখাতা’!
দোকান ঘর না থাকলেও কাস্টমারদের মনে সেলিনার প্রতি রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। হালখাতায় মিষ্টিমুখ করতে আসা এলাকার বাসিন্দা রেজাউল সরদার আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, সেলিনা তাঁর ১৩ বছরের ছেলে আলী হোসেনকে নিয়ে দু-মুঠো ভাতের জন্য যে লড়াই করে যাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। একজন মানুষ এক হাত নিয়ে এত কষ্ট করে পথ চলে! যদি তাঁর একটা স্থায়ী দোকান ঘরের ব্যবস্থা হতো, তবে তিনি পরিবার নিয়ে আরও একটু ভালোভাবে জীবন কাটাতে পারতেন।
নিজের এই কষ্টের দিনগুলো নিয়ে সেলিনা খাতুন বলেন, কারো কাছে হাত পেতে চলতে চাইনি। আল্লাহ আমার একটা হাত কেড়ে নিয়েছেন, কিন্তু মনের জোর তো কেড়ে নেননি! ৫০০ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম, আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছেলেকে বড় করছি। কিন্তু মাথায় করে হেঁটে পান বিক্রি করতে এখন আর শরীর কুলোয় না। একটা ছোট দোকান ঘর থাকলে হয়তো একটু শান্তিতে ব্যবসাটা করতে পারতাম।
বাবার ভাঙা ঘরে ছেলেকে নিয়ে দিন কাটানো এই সংগ্রামী নারী আজ আর কারো করুণার পাত্রী নন, তিনি আত্মমর্যাদার এক জ্বলন্ত প্রতীক। জীবনযুদ্ধে জয়ী এই অদম্য মায়ের একটু নিশ্চিন্ত মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং একটি স্থায়ী দোকান ঘরের জন্য প্রয়োজন সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের একটু সহানুভূতিশীল হাত।
এআইএল/সকালবেলা