আজ শুক্রবার (৫ জুন) সকালে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয়’ ও ‘পরিবেশ বিজ্ঞান, জলবায়ু বিপর্যয় ও বৈশ্বিক পরিবেশ নীতি’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে পরিবেশ দিবসের রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও সরকারের নতুন মেগা পরিকল্পনার বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হলো।
এ বছর ২০২৬ সালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’। এই দূরদর্শী প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি মোকাবিলায় কালবিলম্ব না করে এখনই তাৎক্ষণিক, কঠোর ও কার্যকর টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘের অন্যতম বৃহৎ ও সর্বাধিক স্বীকৃত বৈশ্বিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি হিসেবে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও অসচেতনতার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় ওপরের সারিতে রয়েছে। ক্রমাগত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন, তীব্র নদীভাঙন, অসময়ের আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘমেয়াদী খরা ও ঘন ঘন ধেয়ে আসা তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের পরিবেশ, সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও জনজীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো প্লাস্টিক ও নিষিদ্ধ পলিথিন দূষণ, ইটভাটা ও গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত বায়ুদূষণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ আমাদের চারপাশের পরিবেশগত সংকটকে আরও বেশি তীব্র ও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় কেবল চটকদার স্লোগান নয়, বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত আইনি ও সামাজিক উদ্যোগই কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য টেকসই বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ দূরদর্শী বাণীতে দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশকে সংরক্ষণ করা, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করে একটি টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান কল্যাণমুখী সরকার বিভিন্ন যুগান্তকারী ও কার্যকর দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।”
তিনি সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করে বলেন, “জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। একই সাথে সারা দেশের মৃতপ্রায় ও ভরাট হয়ে যাওয়া ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করার মেগা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও কার্বন নিঃসরণ কমাতে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (Renewable Energy) ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্পায়ন (Green Industrialization), টেকসই সবুজ নগরায়ণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার (Waste Management) মতো নানামুখী ও বৈপ্লবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।”
অন্যদিকে দিবসটি উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ রাষ্ট্রীয় বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, “জলবায়ু ও পরিবেশের এই ভয়াবহ বৈশ্বিক সংকট একক কোনো রাষ্ট্র বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এককভাবে মোকাবিলা করা মোটেও সম্ভব নয়। পরিবেশের ভারসাম্য ফেরাতে সরকারি-private যৌথ খাত, পরিবেশ গবেষক, সুশীল সমাজ এবং দেশের সর্বস্তরের সাধারণ জনগণের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের বিকল্প নেই।” তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সবার প্রতি সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা ও ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির উদাত্ত আহ্বান জানান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানব পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনই মূলত পরিবেশ সুরক্ষায় প্রথম বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের সূচনা ঘটায়। ওই সম্মেলনের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ ৫ জুন দিনটিকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি বছর দিনটি বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত অধিকার রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। আজ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিশেষ র্যালি, সেমিনার ও বৃক্ষমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জান্নাত সকালবেলা