আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয়’ ও ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অপরাধ ও গোয়েন্দা অনুসন্ধান’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে এই স্পর্শকাতর চুরির নেপথ্য কাহিনী বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে ও বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পৃথক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে রঞ্জন চন্দ্র (২৫) ও রেজাকুল ইসলাম (৩২) নামে ওই দুই অপরাধীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসির বিশেষ গোয়েন্দা দল। বিকেলে সিটিটিসি-র একটি নির্ভরযোগ্য উচ্চপদস্থ সূত্র গণমাধ্যমকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে।
সিটিটিসি-র গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, অতি সম্প্রতি সচিবালয়ের মতো দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ও স্পর্শকাতর জোনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিজস্ব রেড টেলিফোন সংযোগের বিশেষ ক্যাবল বা তার চুরির ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কার্যালয়ের ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার এই খবরটি দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নানামুখী আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনাটি জানার পর রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ সংস্থা বিটিসিএল (BTCL) কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ চুরির মামলা দায়ের করে।
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ঘটনার গভীর গুরুত্ব বিবেচনা করে শাহবাগ থানার পাশাপাশি ডিএমপির সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগ ছায়া তদন্ত শুরু করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নজরদারির (Cyber Surveillance) সহায়তায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ের আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্রকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিটিটিসি হেফাজতে নেওয়া হয়।
সিটিটিসির নিবিড় ও কড়া জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অপরাধী রঞ্জন চন্দ্র নিজের অপরাধের কথা অকপটে স্বীকার করেন। তিনি জানান, গত ২২ মে ছুটির সুযোগে বা অসতর্কতার সময়ে সচিবালয়ের ৩ নম্বর ভবনের সংযোগস্থল থেকে তিনি অতি কৌশলে এই বিশেষ তামার তারগুলো কেটে চুরি করেছিলেন। পরবর্তীতে গত ১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ঐতিহ্যবাহী অমর একুশে হলের সামনে অবস্থিত একটি অস্থায়ী ভাঙারির দোকানে গিয়ে প্রতি কেজি মাত্র ৬০০ টাকা দরে মোট ৮ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের এই মূল্যবান রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের তামার তার বিক্রি করে দেন।
আটককৃত রঞ্জন চন্দ্রের দেওয়া সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত তথ্যের ভিত্তিতে সিটিটিসির একটি চৌকস দল বিকেলে রাজধানীর পুরান ঢাকার হোসেনী দালান রোড এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালায়। সেখান থেকে চোরাই মাল কেনার অপরাধে ভাঙারি ব্যবসায়ী রেজাকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রেজাকুলের দেখানো ও স্বীকারোক্তি মতে, তাঁর মালিকানাধীন হোসেনী দালান রোডের একটি গোপন গুদামের ভেতর বিশেষ বস্তায় লুকিয়ে রাখা চুরি হওয়া সবটুকু তামার তার সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
সিটিটিসির প্রাথমিক গোয়েন্দা তদন্তে স্পষ্ট ধারণা করা হচ্ছে যে, এটি কেবল একক কোনো সাধারণ চুরি নয়; বরং সচিবালয়ের ভেতর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও প্রযুক্তিগত সংযোগের তামার তার চুরি করে বাইরে চড়া দামে তামা হিসেবে গলিয়ে বিক্রি করার পেছনে একটি বড় ও সংঘবদ্ধ ইনসাইডার চক্র জড়িত থাকতে পারে। এই চক্রের সাথে সচিবালয়ের আরও কোনো অসাধু কর্মচারী জড়িত আছে কি না, তা শনাক্ত করতে চিরুনি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, বিকেলে ডিএমপির অফিশিয়াল মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে নবনিযুক্ত ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রেড টেলিফোনের তার চুরির ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। আমরা ইতিপূর্বে প্রধান অভিযুক্তসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছি এবং চুরি হওয়া ৮ কেজি ২০০ গ্রাম তামার তার অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছি। চোরাই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি কেনাবেচার অপরাধে ভাঙারি দোকানের মালিককেও আইনি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এই চক্রের মূল উপড়ে ফেলা হবে।” রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা আরও জোরদার করার কথা জানান তিনি।
জান্নাত সকালবেলা