ঈদের সিনেমা দেখতে হলে হলে ছুটছেন তারকারা

প্রকাশ: সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০১:৩২ অপরাহ্ণ
ঈদের সিনেমা দেখতে হলে হলে ছুটছেন তারকারা
নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ আনন্দ ছুটিতে দেশের রূপালী পর্দার প্রেক্ষাগৃহগুলো এখন যেন একেকটি উৎসবের মহাসম্মিলন মঞ্চে পরিণত হয়েছে। রূপালী পর্দায় ঈদের নতুন ধামাকা সিনেমা দেখতে সাধারণ ও সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়ের পাশাপাশি হলগুলোর পরিবেশ আরও বেশি জমজমাট হয়ে উঠছে ওয়ান অব দ্য বেস্ট তারকা, নির্মাতা, প্রযোজক ও কলাকুশলীদের আকস্মিক উপস্থিতিতে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহ থেকেই রাজধানীর আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোতে প্রতিনিয়ত দলবেঁধে ছুটে বেড়াচ্ছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। বড় পর্দায় দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি বসে সিনেমা দেখা, সিনেমা শেষে হলের দরজায় দাঁড়িয়ে দর্শকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া শোনা এবং সিনেমার অফলাইন প্রচারণা চালানো— সব মিলিয়ে এবারের ঈদের চলচ্চিত্র উৎসব ঢালিউডে এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আজ সোমবার (১ জুন) দুপুর ১টা ২২ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিনোদন’ ও ‘চলচ্চিত্র’ বিভাগের এক বিশেষ সরেজমিন প্রতিবেদনে ঈদের বক্স অফিস যুদ্ধ এবং তারকাদের হলে হলে ছুটে চলার এই নতুন ট্রেন্ড বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির দেওয়া অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের মোট ১৮১টি সচল প্রেক্ষাগৃহে একযোগে মুক্তি পেয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট আটটি ভিন্ন স্বাদের সিনেমা। সিনেমাগুলোর তালিকায় রয়েছে— ‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘মালিক’, ‘মাসুদ রানা’, ‘অফিসার’, ‘তছনছ’, ‘পিনিক’ এবং ‘বনলতা সেন’। মুক্তির প্রথম দিন থেকেই প্রতিটি সিনেমার কাস্টিং টিম ও পরিচালক দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ঝটিকা সফর দিয়ে দর্শকদের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন, গল্প করছেন এবং সময় কাটাচ্ছেন। ফলে এই প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক ভিন্নধর্মী লাইভ প্রচারণা এখন ঈদের সিনেমার অন্যতম সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

এবারের ঈদে সবচেয়ে বেশি রেকর্ডসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া মেগা প্রজেক্টের সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম শীর্ষ স্থানে রয়েছে ঢালিউড মেগাস্টার শাকিব খান অভিনীত ‘রকস্টার’। দেশের ১০৩টি প্রধান প্রেক্ষাগৃহে একযোগে একক আধিপত্য নিয়ে চলছে এই ছবিটি। মুক্তির প্রথম দিন থেকেই শাকিবিয়ান ও সাধারণ দর্শকদের মধ্যে সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক ক্রেজ ও আগ্রহ দেখা গেছে। রাজধানীর অভিজাত মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে মুক্তির প্রথম দিনে মাত্র ১৮টি শো নিয়ে এই ছবির যাত্রা শুরু হলেও, দর্শকদের টিকিটের উপচে পড়া চাহিদার কারণে পরদিনই হল কর্তৃপক্ষ শো-এর সংখ্যা বাড়িয়ে একলাফে ৩৬টিতে উন্নীত করতে বাধ্য হয়।

ছবিটির তরুণ পরিচালক আজমান রুশো এবং কেন্দ্রীয় দুই আকর্ষণীয় অভিনেত্রী সাবিলা নূর ও তানজিয়া মিথিলা নিয়মিতভাবে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দর্শকদের আচমকা সারপ্রাইজ দিচ্ছেন। এই প্রসঙ্গে পরিচালক আজমান রুশোর বাস্তবসম্মত ভাষ্য, “‘রকস্টার’ সিনেমাটিতে আমাদের চেনা ঢালিউডি বাণিজ্যিক সিনেমার চেনা ফর্মুলা বা ধারা অনুসরণ করা হয়নি। আমরা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের নতুন ধরনের গল্প ও ভিন্ন ধাঁচের উপস্থাপনা নিয়ে দর্শকদের সামনে আসার সাহস করেছি। তাই দর্শকদের কাছ থেকে চূড়ান্ত ও ম্যাচিউরড প্রতিক্রিয়া বুঝতে আমাদের আরও কিছুদিন সময় লাগবে।”

অন্যদিকে, ভরপুর হাই-ভোল্টেজ অ্যাকশন, রোমান্স ও পারিবারিক বিনোদনের জমজমাট মিশেলে নির্মিত ‘মালিক’ সিনেমাটিও ঈদের দর্শকদের মধ্যে আলাদা এক উন্মাদনা তৈরি করেছে। তরুণ নির্মাতা সাইফ চন্দন পরিচালিত এই তারকাবহুল ছবিটি দেশের মোট ৩২টি প্রেক্ষাগৃহে দাপটের সাথে প্রদর্শিত হচ্ছে। মুক্তির পর ঢাকার বাইরেও কয়েকটি বড় বড় প্রেক্ষাগৃহে এর একাধিক শো টানা ‘হাউসফুল’ হওয়ার সুসংবাদ পাওয়া গেছে।

সিনেমাটির হল প্রচারণায় অংশ নিয়ে জনপ্রিয় ড্যাশিং হিরো আরিফিন শুভ বলেন, “ঈদের উৎসবের দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে যে ধরনের কমার্শিয়াল ও ফুল বিনোদনমূলক সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন, ‘মালিক’ মূলত সেই চেনা উপাদানেই নির্মিত হয়েছে। অ্যাকশন, ইমোশন, প্রেম এবং নিখাদ বিনোদনের এক চমৎকার সমন্বয়ে তৈরি এই ছবিতে দর্শক আমাকে সম্পূর্ণ নতুন এক অ্যাকশন লুকে দেখতে পাবেন।” উল্লেখ্য, এই ছবিতে শুভর বিপরীতে মূল নারী চরিত্রে জমকালো অভিনয় করেছেন চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম।

ঈদের আরেক অত্যন্ত আলোচিত ও প্রশংসিত সিনেমা হলো ‘রইদ’। প্রখ্যাত নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের নিখুঁত পরিচালনায় নির্মিত এই ছবিটির পুরো টিমও মুক্তির প্রথম দিন থেকেই অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক মাঠপর্যায়ের প্রচারণা চালাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন নামী হলে আকস্মিক গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় ও ছবির পেছনের গল্প শেয়ার করছেন নির্মাতা ও কলাকুশলীরা। বেশ কয়েকটি শো ইতোমধ্যেই হাউসফুল হওয়ায় সিনেমাটি নিয়ে সিরিয়াস দর্শকদের মহলে তুমুল পজিটিভ আলোচনা বাড়ছে।

পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ও অ্যাডভেঞ্চারধর্মী গল্প নিয়ে নির্মিত বিগ বাজেটের ‘মাসুদ রানা’ সিনেমাটিও ঈদের তীব্র প্রতিযোগিতার মাঠে ভালো অবস্থানে রয়েছে। সৈকত নাসির পরিচালিত এই হাই-টেক ছবিটি দেশের মোট চারটি বড় মাল্টিপ্লেক্সে আন্তর্জাতিক ফরমেটে মুক্তি পেয়েছে। ছবির মূল শিল্পী ও নির্মাতারা বিভিন্ন হলে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করছেন ও মতামত নিচ্ছেন। এতে প্রধান প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাসেল রানা, পূজা চেরি এবং নবাগত সৈয়দা তিথি অমি। সিনেমাটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও জাজ মাল্টিমিডিয়া।

এদিকে মাল্টিপ্লেক্স বা আধুনিক সিনেপ্লেক্সকেন্দ্রিক রুচিশীল দর্শকদের কাছে প্রথম দিন থেকেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে ক্লাস ঘরানার সিনেমা ‘বনলতা সেন’। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত এই শৈল্পিক ছবিটি বর্তমানে দেশের আটটি প্রধান মাল্টিপ্লেক্সে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রতিদিনই এর বেশ কয়েকটি শো পূর্ণ দর্শক বা শতভাগ টিকিট বিক্রি নিয়ে চলছে বলে হল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। ছবিটিতে একঝাঁক শক্তিশালী থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ডের শিল্পী অভিনয় করেছেন, যাদের মধ্যে আছেন খাইরুল বাসার, গাজী রাকায়েত, সোহেল মণ্ডল, নাজিবা বাশার, প্রিয়তী উর্বি, রূপন্তি আকিদ, শরীফ সিরাজ ও সুমাইয়া খুশি।

দেশীয় চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ঈদে বাংলা সিনেমার প্রচারণার চিরাচরিত ধরণে এক বিশাল ও আধুনিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। আগে যেখানে শুধু ডিজিটাল ট্রেলার, দেয়াল পোস্টার কিংবা টেলিভিশনের কাইন্ডলি ইন্টারভিউ বা টকশো-ই ছিল প্রচারণার একমাত্র প্রধান ভরসা, সেখানে এখন চলচ্চিত্রের মূল শিল্পী ও নির্মাতারা অহংকার ভুলে সরাসরি সাধারণ দর্শকের খুব কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। প্রেক্ষাগৃহে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে দর্শকদের সঙ্গে হাসিমুখে সেলফি তুলছেন, কথা বলছেন, সিনেমা নিয়ে তাদের অকপট সমালোচনা শুনছেন। এর ফলে সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে চলচ্চিত্রের রুপালী পর্দার ও তারকাদের মধ্যকার কৃত্রিম দূরত্ব অনেকটাই কমছে, যা দেশের সিনেমা হলের সুদিন ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখবে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন