বিহারে লালগালিচা বিছিয়ে মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানানো হয়। ছবি: এক্স
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর প্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং গত শনিবার (৩০ মে) ভারতে পৌঁছেছেন। প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম কোনো বিদেশ সফর। ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের’ দেশ ভারত তাঁকে লাল গালিচা বিছিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও সংবর্ধনা জানিয়েছে। পাঁচ দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবেন।
থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইরাবতী’র প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সাবেক সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং তাঁর এই সফরকালে ভারতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে এই সফরকে ‘উষ্ণ অভ্যর্থনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিহার রাজ্যে লাল গালিচা বেয়ে মিনের হেঁটে যাওয়ার ছবি প্রকাশ করেছেন।
সফরের শুরুতেই মিন অং হ্লাইং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান বুদ্ধগয়া পরিদর্শন করবেন। তিনি নিজেকে প্রায়শই মিয়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন; যদিও তাঁরই নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত ৭ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।
রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “তাঁর এই সফর আমাদের দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান শক্তিশালী আধ্যাত্মিক, ঐতিহাসিক ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি চলমান সহযোগিতার গভীরতাকেও তুলে ধরে।” ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ সোমবার (১ জুন) নয়াদিল্লিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করবেন এবং এরপর ভারতের আর্থিক কেন্দ্র মুম্বাই সফর করবেন।
জয়সওয়াল আরও জানান, দুই দেশের শীর্ষ নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও কীভাবে জোরদার করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। নয়াদিল্লির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে মিন অং হ্লাইং মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন এবং এর মাধ্যমে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর বেসামরিক পদে থেকে তাঁর শাসন অব্যাহত রাখেন। মিত্র দেশ চীন বা রাশিয়া নয়, বরং ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ’ ভারতই প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন অং হ্লাইংকে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাল।
এদিকে, মিন অং হ্লাইংয়ের এই ভারত সফরের খবর প্রকাশের পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মিয়ানমারের সমান্তরাল সরকার হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি), দিল্লিতে বসবাসরত মিয়ানমারের নির্বাসিত নাগরিক এবং যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীরা ভারতের মাটিতে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। ‘ইন্ডিয়া ফর মিয়ানমার’ নামের একটি সংগঠন বিক্ষোভের অনুমতি চেয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছে।
সমালোচকদের মতে, যে শাসনব্যবস্থা নিয়মিত নিজ দেশের জনগণের উপর বোমা হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালায়, তাকে ভারতের এই সমর্থন মূলত ‘বন্দুকের জোরে প্রতিষ্ঠিত শাসনকে বৈধতা দেওয়ার’ শামিল। তবে দিল্লির এই কূটনীতিকে অনেকে বাস্তববাদী কৌশল হিসেবে দেখছেন, যার মূল লক্ষ্য মিয়ানমারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করা।