এক ইনজেকশনেই নির্মূল হবে ক্যানসারের টিউমার

প্রকাশ: সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০২:৩৯ অপরাহ্ণ
এক ইনজেকশনেই নির্মূল হবে ক্যানসারের টিউমার
স্বাস্থ্য প্রতিবেদক : বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসার প্রচলিত ও জটিল ধারায় এক নতুন এবং অভাবনীয় সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে একটি পরীক্ষামূলক বিশেষ ইনজেকশন। আন্তর্জাতিক স্তরের এক সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে (Clinical Trial) দেখা গেছে, ‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ (Amivantamab) নামের এই নতুন জীবনরক্ষাকারী ওষুধটি ক্যানসারে আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরের টিউমার সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিকে ক্যানসার নিরাময়ের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।

গত রবিবার (৩১ মে) রাত ১০টা ১১ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘চিকিৎসা’ ও ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য’ বিভাগের এক বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে ক্যানসার প্রতিরোধী এই ইনজেকশনের বিস্ময়কর সাফল্যের বিবরণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ (The Guardian) প্রকাশিত এক বিশেষ বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এই সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের চাঞ্চল্যকর তথ্যটি আন্তর্জাতিক মহলে উঠে এসেছে। বিশ্বের ১১টি উন্নত দেশে যৌথভাবে পরিচালিত এই বিশেষ মানব গবেষণায় এমন সব জটিল ক্যানসার রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাদের শরীরের ক্যানসার কোষগুলো ইতিমধ্যেই রক্তের মাধ্যমে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল (Metastatic) কিংবা চিকিৎসা শেষে পুনরায় মারাত্মকভাবে ফিরে এসেছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই রোগীদের শরীরে প্রচলিত ও নামী কেমোথেরাপি (Chemotherapy) এবং আধুনিক ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy)— দুই ধরণের প্রধান চিকিৎসাই সম্পূর্ণ অকার্যকর বা প্রতিরোধী হয়ে উঠেছিল।

এই বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অংশ নেওয়া মোট ১০২ জন অত্যন্ত জটিল ও শেষ ধাপের মাথা ও গলার ক্যানসার (Head and Neck Cancer) রোগীর ওপর ওষুধটি প্রয়োগ করা হয়। ট্রায়াল শেষে দেখা যায়, এর মধ্যে ৪৩ জন রোগীর শরীরের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে আকারে ছোট হয়ে গেছে কিংবা শরীর থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রাপ্ত ফলাফলের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৮ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমারটি আকারে আশঙ্কাজনক স্তর থেকে অনেকটা কমে এসেছে এবং ১৫ জন মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসারের টিউমারটি শরীর থেকে একেবারেই পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

লন্ডনের বিখ্যাত ‘ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ’-এর (ICR) জৈবিক ক্যানসার থেরাপি বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন এই সফলতার বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “যেসব ক্যানসার রোগীর শরীর কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি— দুই ধরনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার প্রতিই সম্পূর্ণ প্রতিরোধী বা রেজিস্ট্যান্ট হয়ে উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে এই নতুন ইনজেকশনের মাধ্যমে এমন ফলাফল পাওয়া সত্যিই নজিরবিহীন ও অবিশ্বাস্য। সাধারণত এই স্তরে পৌঁছানো রোগীদের বাঁচিয়ে রাখার মতো চিকিৎসার সুযোগ চিকিৎসকদের হাতে খুবই সীমিত থাকে। তাই এই সংকটময় মুহূর্তে এই মাত্রার সাফল্য বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা।”

গবেষকরা জানিয়েছেন, এই যুগান্তকারী গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল খুব শীঘ্রই যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বের বৃহত্তম ক্যানসার বিষয়ক সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’ (ASCO)-র বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে।

ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, এই অ্যামিভান্টাম্যাব ইনজেকশনটি মূলত মানব শরীরে একসাথে তিনভাবে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। প্রথমত, এটি ক্যানসার টিউমারের বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করা ‘ইজিএফআর’ (EGFR) নামক ক্ষতিকর প্রোটিনকে ব্লক বা বাধা দেয়; দ্বিতীয়ত, ক্যানসার কোষগুলোর চিকিৎসা এড়ানোর বা লুকিয়ে থাকার একটি অন্যতম গোপন পথ ‘এমইটি’ (MET) চিরতরে বন্ধ করে দেয় এবং একই সাথে এটি রোগীর শরীরের নিজস্ব প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে (Immune System) ক্যানসার টিউমারের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে সক্রিয় করে তোলে।

বিশ্ব কাঁপানো এই আধুনিক ক্যানসার ওষুধটি তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বহুজাতিক হেলথকেয়ার কোম্পানি ‘জনসন অ্যান্ড জনসন’ (Johnson & Johnson)। বর্তমানে ফুসফুসের ক্যানসার (Lung Cancer) ছাড়াও মানুষের শরীরের কোলোরেক্টাল, মস্তিষ্ক এবং পাকস্থলীর জটিল ক্যানসারে এই ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাই করতে বিশ্বজুড়ে আরও প্রায় ৬০টি পৃথক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে চলমান রয়েছে।

এই পরীক্ষামূলক ট্রায়ালে অংশ নিয়ে নতুন জীবন ফিরে পাওয়া ৫৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক কার্ল ওয়ালশ নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান, গত ২০২৪ সালে প্রথম তাঁর জিহ্বায় ক্যানসার (Tongue Cancer) ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের দেওয়া একাধিক দামি কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি বেঁচে থাকার শেষ আশা হিসেবে এই পরীক্ষামূলক ইনজেকশন চিকিৎসায় অংশ নেন। কার্ল ওয়ালশ বলেন, “এই ইনজেকশন চিকিৎসা শুরু করার আগে আমি ক্যানসারের যন্ত্রণায় ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না, কিছু গিলতে বা খেতেও প্রচণ্ড কষ্ট হতো। কিন্তু ইনজেকশন নেওয়ার পর এখন আমার গলার ফোলাভাব এবং ভেতরের তীব্র ব্যথা দুটোই অলৌকিকভাবে কমে গেছে। আমি আবার আগের মতো সুস্থ মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি।”

ইনস্টিটিউটের গবেষকরা আরও একটি স্বস্তির তথ্য জানিয়েছেন যে, প্রচলিত অন্য অনেক ক্যানসার চিকিৎসার মতো রোগীকে হসপিটালের বেডে শুইয়ে শিরার (Intravenous) মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ওষুধ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। অ্যামিভান্টাম্যাব মূলত মানুষের ত্বকের নিচে (Subcutaneous) ছোট ও সাধারণ একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রতি তিন সপ্তাহে মাত্র একবার পুশ করা হয়, যা রোগীদের শারীরিক কষ্ট কমানোর পাশাপাশি সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় করে।

সবচেয়ে আশার কথা হলো, এই চিকিৎসার ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো (Side Effects) বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই ছিল অত্যন্ত মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার। ট্রায়ালে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জনে একজনেরও কম রোগী এই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন, যা ক্যানসারের অন্যান্য কড়া ওষুধের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ।

ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের প্রধান নির্বাহী (CEO) ক্রিস্টিয়ান হেলিন এই গবেষণার সামগ্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সীমাবদ্ধ চিকিৎসা বিকল্প থাকা শেষ ধাপের ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রেও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কীভাবে বাস্তব অগ্রগতি আনতে পারে, এই গবেষণা বিশ্ববাসীর সামনে তার একটি জীবন্ত ও শক্তিশালী উদাহরণ। কঠিন প্রকৃতির ক্যানসার আক্রান্তদের মধ্যে এমন ইতিবাচক সাড়া এবং রোগীদের বেঁচে থাকার এই আশাব্যঞ্জক ফলাফল মানব সভ্যতার জন্য একটি বিশাল বড় সুখবর।”

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন