ইসলামে চাঁদ দেখাকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ইবাদতের সময় নির্ধারণের প্রধান শরয়ি বিধান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহান আল্লাহ চাঁদকে মানুষের সময় গণনা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের নির্ধারক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে চাঁদ দেখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে শিক্ষা দিয়েছেন।
রমজানের রোজা, কোরবানি, ঈদ, হজ ও মহররমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলো চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। হাদিসে এসেছে, ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজানের চাঁদ দেখবে তখন রোজা রাখবে এবং যখন শাওয়ালের চাঁদ দেখবে তখন ঈদ পালন করবে। আর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলে গণনা পূর্ণ (৩০ দিন) করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
ইবাদতের নির্ভুল সময় নির্ধারণে মহানবী (সা.) চাঁদের হিসাব রাখার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। বিশেষ করে শাবান মাসের হিসাব তিনি খুব যত্ন সহকারে রাখতেন যাতে রমজানের সঠিক তারিখ নির্ধারণে ভুল না হয়। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের হিসাবের ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো মাসের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
ইসলামি শরিয়তে উদয়াচলের (Horizon) ভিন্নতা ও ভৌগোলিক দূরত্ব একটি স্বীকৃত বিষয়। পৃথিবীর সব স্থানে সূর্যোদয় ও চন্দ্রোদয়ের সময় এক নয়। এ কারণে এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অনেক দূরের অন্য অঞ্চলের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। কুরাইব (রা.)-এর বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, সিরিয়ায় শুক্রবার রাতে চাঁদ দেখা গেলেও মদিনায় ইবনে আব্বাস (রা.) তা গ্রহণ করেননি; কারণ মদিনায় চাঁদ দেখা গিয়েছিল শনিবার। ইবনে আব্বাস (রা.) জানিয়েছিলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের চাঁদ দেখার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তিকে আলাদাভাবে চাঁদ দেখতে হবে এমন নয়। যদি কোনো নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দেন, তবে তা নিকটবর্তী অঞ্চল বা একই ভূখণ্ডের সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হবে। হাদিসে বর্ণিত আছে, দুজন বেদুইন এসে শাওয়ালের চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে রোজা ভাঙার ও ঈদগাহে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরিশেষে, চাঁদ দেখার বিধানের মধ্যে ইসলামের শৃঙ্খলা, বাস্তবতা ও সামাজিক ঐক্যের সৌন্দর্য নিহিত। এটি যেমন একটি ধর্মীয় দায়িত্ব, তেমনি ভৌগোলিক কারণে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে সময়ের পার্থক্যও ইসলামের সহজতারই বহিঃপ্রকাশ।