কোটালীপাড়ায় ক্রেডিট ইউনিয়নের কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কর্মচারী উধাও
আরিফ হাজরা, কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারী ক্রেডিট ইউনিয়নের সাধারণ সদস্য ও শিক্ষকদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় এবং জামানতের প্রায় ১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ আদায়কারী উত্তম সরকারের বিরুদ্ধে। গত ৩১ জুলাই থেকে অভিযুক্ত ওই কর্মচারীকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে ক্রেডিট ইউনিয়ন পরিচালনা পর্ষদ।
অভিযুক্ত উত্তম সরকার কোটালীপাড়া উপজেলার বান্দর গ্রামের নিমাই সরকারের ছেলে। তিনি ২০১৮ সালের মে মাসে কোটালীপাড়া মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারী ক্রেডিট ইউনিয়নে অর্থ আদায়কারী হিসেবে যোগদান করেছিলেন।
ক্রেডিট ইউনিয়ন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সদস্যদের কাছ থেকে জামানত ও ঋণের কিস্তির টাকা নিয়মিত আদায় করতেন উত্তম সরকার। কিন্তু সেই টাকা প্রতিষ্ঠানের মূল ফান্ড বা ক্যাশ বইয়ে জমা না দিয়ে তিনি নিজের কাছে রেখে দিতেন। গত জুলাই মাসে ক্রেডিট ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ তার কাছে বার্ষিক ও মাসিক হিসাব চাইতে গেলে তিনি আর কর্মস্থলে ফেরেননি এবং মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।
পরে পরিচালনা পর্ষদ জরুরি ভিত্তিতে ফান্ডের যাবতীয় হিসাব-নিকাশ ও ক্যাশ বই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে প্রায় এক কোটি টাকার বিশাল গরমিল দেখতে পায়। অভিযুক্ত উত্তম সরকার এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে ক্রেডিট ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষক ও সদস্যদের অভিযোগ:
পিঞ্জুরী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীহাররঞ্জন বারুরী জানান, তাঁর নিজের নামে ২৪ হাজার এবং স্ত্রীর নামে ৫৫ হাজার টাকা ক্রেডিট ইউনিয়নে জামানত রাখা ছিল। কিন্তু উত্তম সরকার সেই টাকা ক্যাশ বইয়ে পোস্টিং না করে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছেন।
কোটালীপাড়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক অসীম বিশ্বাস জানান, তাঁর ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা ক্যাশ বইয়ে জমা দেখানো হয়নি। তিনি তাঁর গচ্ছিত পুরো টাকা অবিলম্বে ফেরত চান।
ওয়েস্ট কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক আবু জাফর হাওলাদার জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে তিল তিল করে সঞ্চয় করে মোট ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ক্রেডিট ইউনিয়নে জমা রেখেছিলেন। উত্তম সরকার তাঁর পাসবইয়ে টাকা তুলে দিলেও মূল ক্যাশ বইয়ে তা জমা করেননি।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ আত্মসাতের সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত উত্তম সরকার। গণমাধ্যমের কর্মীরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে না পেলেও, পরবর্তীতে তিনি এক গোপন স্থান থেকে মুঠোফোনে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। উত্তম সরকারের দাবি, তিনি প্রতিদিনের সংগৃহীত ঋণের কিস্তি ও জামানতের টাকা তৎকালীন ম্যানেজার ইদ্রিসুর রহমানের কাছে নিয়মমাফিক বুঝিয়ে দিতেন। তাই তাঁর একাই অর্থ আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগ ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
তবে ক্রেডিট ইউনিয়নের সাবেক ম্যানেজার ইদ্রিসুর রহমান এই দাবি খণ্ডন করে জানান, দৈনিক সংগৃহীত টাকা ক্যাশ বইয়ে লিখে ব্যাংকে জমা দেওয়ার মূল দায়িত্ব ছিল উত্তম সরকারের। কিন্তু তিনি বহু সদস্যের ক্ষেত্রে তা ইচ্ছাকৃতভাবে করেননি। ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রায় ৭৯৫ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত তিন শতাধিক সদস্যের টাকার বড় ধরনের গরমিল রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বর মাসেই তিনি ম্যানেজারের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে কোটালীপাড়া মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারী ক্রেডিট ইউনিয়নের সভাপতি সরওয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, “প্রাথমিক কাগজপত্র ও ক্যাশ বই যাচাই-বাছাই করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, উত্তম সরকারই এই বিশাল অর্থ আত্মসাতের মূল হোতা এবং এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত।”
তিনি আরও জানান, “অভিযুক্ত উত্তমের পরিবারের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের কথা হয়েছে। তাঁর বাবা সামাজিকভাবে বিষয়টি বসে মীমাংসা করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এর সুরাহা না হলে ক্রেডিট ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”