পাগলা মসজিদে মিলল ৪৩ বস্তা টাকা, গণনায় ৬ শতাধিক লোক
নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ ছয় মাস পর আবারও কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩টি লোহার সিন্দুক এবং ৩টি অস্থায়ী ট্রাঙ্কের দানবাক্স খোলা হয়েছে। এবার দানবাক্সগুলো থেকে রেকর্ড ৪৩ বস্তা দেশি-বিদেশি মুদ্রাসহ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কার পাওয়া গেছে। বর্তমানে মসজিদ চত্বরে ৬ শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণে বিরতিহীনভাবে চলছে টাকা গণনার কাজ।
আজ শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৭টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এই দানবাক্সগুলো খোলা হয়। এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দানবাক্স খুলে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা এবং বিদেশি মুদ্রাসহ স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কার পাওয়া গিয়েছিল। এবার সময়ের ব্যবধান বেশি হওয়ায় আগের সব রেকর্ড ভেঙে আরও কয়েকগুণ বেশি টাকা মিলবে বলে ধারণা করছে মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানসহ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, র্যাব, পুলিশ, আনসার ও জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সকাল ৭টায় এসব দানবাক্স খোলা হয়। দুপুর ১২টার মধ্যেই প্রাথমিক গণনা শেষে ১০ কোটি টাকা রূপালী ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। বাকি টাকা গণনার কাজ শেষ হতে রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টা বেজে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন রূপালী ব্যাংকের এজিএম মোহাম্মদ আলী হারেসী।
কিশোরগঞ্জ শহরের মাঝপথ দিয়ে প্রবাহিত নরসুন্দা নদী সংলগ্ন হারুয়া এলাকায় অবস্থিত প্রায় দুই শ বছরের অধিক সময়ের পুরোনো এই ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ। লোকমুখে প্রচলিত আছে, শহরের হয়বতনগর জমিদার বাড়ির পূর্বপুরুষ আধ্যাত্মিক সাধক (পাগল হিসেবে পরিচিত) জিল কদর খান এক সময় নরসুন্দা নদীর মাঝপথে জেগে ওঠা উঁচু টিলাতে তাঁর আস্তানা গড়ে তোলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ওই আস্তানাটি মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর থেকেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের এক অনন্য স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে এই মসজিদটি। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস— যেকোনো নেক মকসুদ পূরণের জন্য নিয়ত করে এই মসজিদের দানবাক্সে দান করলে মনের বাসনা পূর্ণ হয়। আর এমন বিশ্বাস থেকেই প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ সেখানে মানত ও দান করতে ভিড় জমান।
কিশোরগঞ্জ রূপালী ব্যাংকের এজিএম মোহাম্মদ আলী হারেসী জানান, এবার টাকার পরিমাণ আগের বারের চেয়ে অনেক বেশি। দুপুর ১২টার মধ্যে গুনে ফেলা ১০ কোটি টাকা ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে এবং বাকি টাকা গণনার জন্য ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মাদ্রাসার ছাত্র ও কমিটির লোকজন নিরলস কাজ করছেন।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, বিপুল পরিমাণ এই অর্থ গণনা কাজের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাব, ব্যাটালিয়ন আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শতাধিক কর্মকর্তা ও সদস্য পুরো মসজিদ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছেন।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, এই দানের টাকা দিয়ে প্রথা অনুযায়ী বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানাসহ দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত অসহায় মানুষ এবং দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। তবে বর্তমানে ১১৪ কোটি টাকার স্থায়ী তহবিল নিয়ে একটি সর্বাধুনিক ও সুবিশাল ‘পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্স’ নির্মাণের মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে ৩০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। একই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশ-বিদেশের মানুষের সুবিধার্থে অনলাইনেও পাগলা মসজিদে দানের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে ইতোমধ্যে ৫ লাখেরও বেশি টাকা জমা পড়েছে।
|