কাগজেই সীমাবদ্ধ বিএনপির ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৭ অপরাহ্ণ
কাগজেই সীমাবদ্ধ বিএনপির ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি

বিশেষ প্রতিনিধি: নেতৃত্বে নতুনদের সুযোগ সৃষ্টি ও জবাবদিহিতা বাড়াতে গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতা, এক পদ’ বিধান যুক্ত করেছিল বিএনপি। তবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও নীতিটির পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটেনি। বরং দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত বহু নেতা এখনও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে রেখেছেন। ফলে কাক্সিক্ষত পদোন্নতি না পেয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ ও উদীয়মান কর্মীরা।

সম্প্রতি বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। কারণ, দলীয় পদে বহাল থাকা একাধিক নেতা বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলীয় গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল একই সময়ে একাধিক দলীয় দায়িত্বে থাকার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন; বর্তমানে কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে অন্তত দুই ডজন নেতা একাধিক সাংগঠনিক পদ দখল করে আছেন। অথচ গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর দল পুনর্বিন্যাসের কাজ চলমান রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিবের পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বে বহাল আছেন। অনুরূপভাবে আসাদুল হাবিব দুলু বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ার পাশাপাশি লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতির পদ সামলাচ্ছেন। আবার খায়রুল কবির খোকন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব পদে থাকার পরও নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতির চেয়ার ছাড়েননি।

বিএনপির গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে থাকতে পারবেন না। এ ছাড়া জাতীয় স্থায়ী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ, জাতীয় নির্বাহী কমিটির পদধারী এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকার ওপর আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে।

নীতিটির বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জানান, বিগত সরকারের আমলে নেতাকর্মীদের ওপর মামলা-হামলা, জেল-জুলুম ও আত্মগোপনে থাকার কারণে বিধানটি শতভাগ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নীতি পুরোপুরি বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির পথ রুদ্ধ থাকায় ক্ষোভ জমা হচ্ছে তৃণমূলে। দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় তিন ডজন নেতাকর্মীর বক্তব্যে এমন অসন্তোষের চিত্র ফুটে উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় এক নেতা মন্তব্য করেন, একজন ব্যক্তি দুটি বা তিনটি পদ ধরে রাখলে যোগ্যদের ওপরে ওঠার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার বলেন, নীতিটি দ্রুত প্রয়োগ করা হলে বহু যোগ্য নেতা মূলধারায় মূল্যায়িত হতেন। একই সুর পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি দুলাল ফকির ও ছাত্রদলের ঢাকা উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ ইকবালের গলায়। তাঁদের মতে, এ নীতি কার্যকর হলে প্রতিটি ইউনিটে নতুন ও নিবেদিতপ্রান নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে।

অবশ্য অতীতে কিছু নেতা এই বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর অতিরিক্ত পদ ছেড়ে দেন। একইভাবে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর যুবদলের সভাপতির পদ ত্যাগ করেছিলেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের দিকে একাধিক পদে থাকা ৬০ জনের মধ্যে ৪৪ জন নেতা একটি পদ রেখে বাকিগুলো ছেড়ে দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি পুনর্বহালের চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। দলটির স্থায়ী কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ব্যক্তিস্বার্থে একাধিক পদ আটকে রাখার এই মানসিকতা শেষ পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন