বন্যপ্রাণী রক্ষায় জলবায়ু প্রকল্প
অনক আলী হোসেন শাহিদী: বাংলাদেশের বনাঞ্চলে বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর পুনঃপ্রবর্তন (রি-ইন্ট্রোডাকশন), হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে জলবায়ু সহনশীল বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলার একটি বৃহৎ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বন অধিদপ্তর ‘জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন: বাংলাদেশের বনাঞ্চলে বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, রি-ইন্ট্রোডাকশন ও হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসন প্রকল্প’ নামের একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটির সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের মোট বাজেট ১১ কোটি ১৮ লাখ ১৩ হাজার ১০০ টাকা। ইতোমধ্যেই ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ৬৬০ জন মাঠকর্মীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কনসালটেন্ট ফার্ম নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো শাল, ম্যানগ্রোভ ও মিশ্র চিরহরিৎ বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনা এবং হাতির আবাসস্থল এলাকার সংঘাত কমিয়ে আনা।
প্রকল্পের আওতায় ময়ূর, উল্লুক, চীনা বনরুই, কালোমুখো প্যারাপাখি, সাম্বার হরিণ ও হাতি সুরক্ষায় বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সংক্রান্ত ডেটা ও তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার রূপরেখা তৈরি করা হবে।
মধুপুর জাতীয় উদ্যানের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে বিলুপ্ত হওয়া ময়ূরকে পুনঃপ্রবর্তনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর জন্য উপযুক্ত খাদ্য, নিরাপদ আবাসস্থল ও প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় হাতি-মানুষ সংঘাত সামলাতে গঠন করা হচ্ছে ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ERT)। এই টিমগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লোকালয় রক্ষা এবং হাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সুন্দরবনে বিপন্ন প্রজাতির কালোমুখো প্যারাপাখির আবাস্থল ও হটস্পট চিহ্নিতকরণে সমন্বিত জরিপ পরিচালিত হবে। সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরহরিৎ বনাঞ্চলে উল্লুক ও চীনা বনরুইয়ের সঠিক সংখ্যা নিরূপণে জরিপ করা হবে। চোরাশিকারিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা এসব বন্যপ্রাণীকে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপযুক্ত বনে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের বনাঞ্চলে সাম্বার হরিণ পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিশদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানো হবে। রাজকান্দি, আতোয়া ও পাথারিয়া সংরক্ষিত বনে বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় স্থানীয় অধিবাসীদের যৌথ টহল দল গঠন করা হবে। পাশাপাশি বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরতা কমাতে জলবায়ু সহনশীল কৃষিপদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রকল্প পরিচালক সানাউল্লাহ পাটোয়ারী বলেন, "প্রকল্পের নির্ধারিত সকল কার্যক্রম আইনি ও পরিবেশগত বিধিমালা মেনে শুরু হয়েছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য শুধু কয়েক জাতের প্রাণী রক্ষা করা নয়, বরং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্যমূলক সহাবস্থান তৈরি করা।"
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ডক্টর ফাহমিদা খানম বলেন, "স্থানীয় জনগণকে বাইরে রেখে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ও কার্বন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।"
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, "হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসনে ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ এবং স্থানীয়দের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে অর্জিত জ্ঞান ভবিষ্যতে অন্যান্য বনাঞ্চলেও কাজে লাগানো হবে।"
আবাসস্থল সংকোচন, চোরাশিকার এবং মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাতের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের জন্য এই প্রকল্প একটি অনন্য মাইলফলক। তবে প্রকল্পটির পূর্ণ সাফল্য নির্ভর করবে—উদ্ধার ও অবমুক্তকৃত প্রাণীগুলোর টিকে থাকার হার, হাতি-মানুষ সংঘাত কমানোর কার্যকারিতা এবং স্থানীয় জনগণের টেকসই অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার ওপর।
এআইএল/সকালবেলা
|