দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ

প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ১২:৪৩ অপরাহ্ণ
দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান পরিমাপক ‘গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) ২০২৬’ এর সর্বশেষ খতিয়ানে দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনি ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’ (আইইপি) কর্তৃক প্রকাশিত এই বাৎসরিক সূচকে সামাজিক নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিভিন্ন মেথড বা সূচকে প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও চির অশান্ত আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ।

আজ রবিবার (১৪ জুন) দুপুরে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও থিংক ট্যাংক খতিয়ান’ এবং ‘সাউথ এশিয়ান স্ট্যাবিলিটি, পেন্টাগন স্ট্র্যাটেজিক উইং ও রিস্ক অ্যানালাইসিস সেল’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে ২০২৬ সালের বিশ্ব শান্তি সূচকের পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিবরণ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

জিপিআই ২০২৬ এর খতিয়ান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ৯৯.৭ শতাংশ জনসংখ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করে ১৬৩টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও ভূখণ্ডের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্র তথা—সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় সামরিকীকরণ কন্ডিশনের ওপর ভিত্তি করে মোট ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন উপ-সূচকের গাণিতিক মূল্যায়নে এই শান্তির হিসাব করা হয়। এই সূচকের নিয়ম বা মেথড অনুযায়ী, কোনো দেশের প্রাপ্ত স্কোর যত কম হবে, সেই দেশে শান্তির মাত্রা তত বেশি হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৬৩টি দেশের এই তালিকায় ৫-এর মধ্যে ২.২২৬ স্কোর নিয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম। আইইপি তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘মিডিয়াম’ বা মধ্যম শান্তির দেশ হিসেবে অভিহিত করেছে। উপ-সূচকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোরের চিত্রটি নিম্নরূপ:

সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষায়: ২.৫৭৯ চলমানঅভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংঘাতে: ২.২৩৭সামরিকীকরণের মাত্রায়: ১.৬১৫

দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বরাবরের মতোই এবারও এ অঞ্চলের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে হিমালয় কন্যা ভুটান। বৈশ্বিক তালিকায় ১৬তম স্থানে থাকা ভুটানই দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র রাষ্ট্র, যাদের শান্তির মাত্রাকে ‘উচ্চ’ (High) ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক সূচকে ৬৭তম স্থান নিয়ে এ অঞ্চলে দ্বিতীয় শ্রীলঙ্কা এবং ১১১তম স্থান নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে নেপাল।

অন্যদিকে, চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও সীমান্ত উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘নিম্ন’ শান্তির মাত্রায় নেমে গেছে পরাশক্তি ভারত; দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের অবস্থান পঞ্চম এবং বিশ্বে ১২৭তম। এছাড়া যথাক্রমে ১৫২ ও ১৫৭তম স্থানে থাকা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান বরাবরের মতোই এই অঞ্চলের সবচেয়ে অশান্ত ও অস্থিতিশীল দেশ হিসেবে তলানিতে অবস্থান করছে। সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালে শান্তির সূচকে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক পতনটি দেখেছে দক্ষিণ এশিয়াইএ অঞ্চলের শান্তির সূচক গড়ে ২.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

বৈশ্বিক খতিয়ানে টানা ১৯ বছরের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও স্বর্গীয় দেশের শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে ইউরোপের দেশ আইসল্যান্ড। তাদের ঠিক পরেই শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড।

বিপরীতে, ইউক্রেন যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অবরোধের জেরে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ বা সবচেয়ে অশান্ত দেশের নিকৃষ্টতম স্থানটি জুটেছে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার কপালে। সবচেয়ে অশান্ত দেশের তালিকায় রাশিয়ার ঠিক পরেই রয়েছে সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অভ কঙ্গো, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইসরায়েল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে বৈশ্বিক শান্তির মাত্রা কমেছে ০.৭ শতাংশ; এ নিয়ে টানা ১২ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে শান্তির সূচকে এই ধারাবাহিক অবনতির কন্ডিশন দেখা গেল।

শান্তির এই বৈশ্বিক প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ও সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকটিও অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশকে একটি সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী ও জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে আইইপি সতর্ক করেছে যে, বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চড়া দাম ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে দেশের অর্থনীতি বড় ধরণের ধাক্কা খেতে পারে।

জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশগত হুমকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। থিংক ট্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যদি আরও ঘনীভূত হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক বা বাণিজ্যিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় দেশের মোট জিডিপির (Gross Domestic Product) ১.৫ থেকে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত আকাশচুম্বী হয়ে যেতে পারে। চরমভাবাপন্ন এই পরিস্থিতিতে প্রথম বছরেই বৈশ্বিক জিডিপি ০.৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে, যার সবচেয়ে নির্মম শিকার হবে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর উদীয়মান অর্থনীতিগুলো।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন