২৯২ কোটি টাকার বিনিয়োগে বিএডিসির বীজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি

প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০১:৪০ অপরাহ্ণ
২৯২ কোটি টাকার বিনিয়োগে বিএডিসির বীজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি


অনক আলী হোসেন শাহিদী: দেশের কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী, টেকসই ও উৎপাদনমুখী কাঠামোয় রূপান্তর করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার রূপরেখা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় কৃষি খাতে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে “বিএডিসির বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্প”। বিশেষ করে কৃষকের উৎপাদন সুরক্ষা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য ৩১ দফার ২৭ নম্বর দফায় নির্ধারণ করা হয়েছে, এই প্রকল্প তারই একটি কার্যকর প্রতিফলন—যা বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কৃষি অর্থনীতিতে একটি নতুন গতি সঞ্চার করবে। ৩১ দফার ২৭ নম্বর দফায় উল্লেখ রয়েছে—“কৃষকের উৎপাদন ও বিপণন সুরক্ষা নিয়ে কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।”


দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) গ্রহণ করেছে একটি বৃহৎ পরিসরের উন্নয়ন উদ্যোগ। “বিএডিসির বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প” শীর্ষক এই প্রকল্পটি দেশের কৃষি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


তিন বছর মেয়াদী এই প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯২ কোটি টাকা। প্রকল্প পরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল জানান, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে আগস্ট মাস থেকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের যাবতীয় কার্যক্রম চালু হয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী তা এগিয়ে চলছে।


তিনি আরও বলেন, “আগামী জুন মাস নাগাদ প্রকল্পের কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। আমরা নিয়মতান্ত্রিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খুব দ্রুতই বিএডিসির সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে প্রয়োজনীয় আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ নিশ্চিত করবো। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছি এবং সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করছি।”


এই প্রকল্পের আওতায় ২০১ সাল নাগাদ এক লক্ষ ২৫ হাজার ৭৮০ মেট্রিক টন ভিত্তিবীজসহ বিভিন্ন প্রকার মানসম্মত বীজ—যেমন ধান, গম, আলু, ডাল ও তৈলবীজ এবং চারা-কলম উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। বিদ্যমান বীজ কার্যক্রমে ৮,২১৯টি কৃষি যন্ত্রপাতি সংগ্রহের মাধ্যমে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। একই সঙ্গে দুটি আধুনিক বীজ সংরক্ষণাগার ও দুটি ট্রানজিট বীজ গুদাম নির্মাণ করা হবে। সরকারি জমি সংরক্ষণের জন্য ৫৩ হাজার ৭৮৭ মিটার সীমানা প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বীজ সংগ্রহ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৮টি ট্রাক ও ৫৭টি মোটরসাইকেল ক্রয় করা হবে। পাশাপাশি বীজ কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে ২৩টি জরাজীর্ণ স্থাপনা এবং অচল কৃষি যন্ত্রপাতি ও যানবাহন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।


এই প্রকল্পের আওতায় বিএডিসির বীজ উদ্যানসমূহে উচ্চ ফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধক্ষম বীজ উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দক্ষ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। কৃষির প্রতিটি ধাপে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকরা সময়মতো মানসম্মত বীজ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


বিএডিসির চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলাম বলেন, “চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমি সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিএডিসির সকল প্রকল্প বাস্তবায়নে সতর্ক নজর রাখছি। এই প্রকল্পটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে যাতে নির্ধারিত সময়ে ও মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন হয়।”


চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলামের নেতৃত্বে বিএডিসির সার্বিক কার্যক্রমে একটি ইতিবাচক গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সাথে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উইং—বিশেষ করে বীজ উদ্যান উইং, সার ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সেচ উইং—নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। তার এই নিবিড় তদারকি ও কার্যকর দিকনির্দেশনার ফলে বিএডিসির প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কর্মদক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। উন্নতমানের বীজের সহজলভ্যতা কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে, যা সামগ্রিকভাবে কৃষি খাতকে আরও শক্তিশালী করবে।


কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ডক্টর রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, “দেশের কৃষি খাতকে আধুনিক, টেকসই ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে বিএডিসির এই ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে মানসম্মত বীজ পৌঁছানো সহজ হবে, যা সরাসরি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। আমরা মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান অব্যাহত থাকবে।”


কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “বর্তমান সরকার কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার রূপরেখা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশেষ করে কৃষকের উৎপাদন ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার যে দৃষ্টিভঙ্গি ২৭ নম্বর দফায় প্রতিফলিত হয়েছে, বিএডিসির এই আধুনিকায়ন প্রকল্প তার একটি বাস্তব রূপ। এ ধরনের উদ্যোগ কৃষিকে লাভজনক, আধুনিক ও টেকসই খাতে পরিণত করবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিতে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে।”


পর্যবেক্ষণ মন্তব্য: সমগ্র বিবেচনায় দেখা যায়, বিএডিসির বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রকল্পটি দেশের কৃষি খাতে একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত উদ্যোগ। প্রশাসনিক পর্যায় থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত প্রচেষ্টা, নেতৃত্বের কার্যকর তদারকি এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই প্রকল্প দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিকাশে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

মন্তব্য করুন