সফিকুল ইসলাম: টানা দুই সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার নিয়ে এক ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটাই কথা—'সিলিন্ডার আছে, গ্যাস নাই'। সংকটের দোহাই দিয়ে সিলিন্ডার ব্যবসায়ীরা লিপ্ত হয়েছেন এক অদৃশ্য ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলায়। বাজারে প্রকাশ্যে গ্যাসের দেখা না মিললেও মুঠোফোনে উচ্চমূল্য ঠিক করলে অজানা স্থান থেকে ঠিকই হাজির হচ্ছে সিলিন্ডার। বিইআরসি নির্ধারিত ১২৫৩ টাকার ১২ লিটারের সিলিন্ডার এখন খুচরা পর্যায়ে ২৮০০ থেকে শুরু করে ৩২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এ যেন এক প্রকাশ্য লুটতরাজ, যেখানে প্রশাসনের নজরদারি থাকলেও প্রতিকার মিলছে না বলে অভিযোগ সাধারণ ভোক্তাদের।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ খুচরা দোকানে কেবল খালি সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন গ্যাস নেই, কিন্তু পর্দার আড়ালে চিত্র ভিন্ন। ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করলে ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, দোকানে গ্যাস নেই তবে ‘ব্যবস্থা করা যাবে’। উত্তরা এলাকার বাসিন্দা মাসুদুল হাসান গত এক সপ্তাহ ধরে আড়াই হাজার টাকা দিয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না। একই চিত্র রামপুরা, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায়। অনেক রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকান গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। রামপুরা ডিআইটি রোডের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাবিব জানান, গত সপ্তাহে ২৫০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনলেও এখন চড়া দামেও সরবরাহকারী ফোন ধরছে না। গৃহিণীরাও পড়েছেন চরম বিপাকে; বাসার লাইনের গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডারই একমাত্র ভরসা, যা এখন সোনার হরিণ।
এলপিজি সংকটের নেপথ্যে আমদানির ঘাটতি ও কৃত্রিম মজুতকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আমদানি বাড়লেও গত বছর আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। যেখানে প্রতি বছর ১০ শতাংশ চাহিদা বাড়ে, সেখানে উল্টো ১০ শতাংশ আমদানি হ্রাস পাওয়ায় বাজারে তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গত বছর আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন, যা আগের বছরের ১৬ লাখ ১০ হাজার টনের চেয়ে অনেকটা কম। বিইআরসির কর্মকর্তাদের মতে, আমদানির এই নিম্নমুখী তথ্য সরকারের কাছে থাকলেও সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংকট ঘনীভূত হয়েছে। অন্যদিকে, এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি সরকারকে দায়ী করেছেন।
এদিকে, সংকটের সুযোগে এক বিশাল অংকের কালো টাকার সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্ধারিত মূল্যে ১২ কেজির সিলিন্ডারে খুচরা ব্যবসায়ীর লাভ মাত্র ৫০ টাকা হলেও সংকটের কারণে প্রতিটি সিলিন্ডারে ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মুনাফা করা হচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস জানান, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী মজুত গড়ে তুলেছে এবং যারা বেশি টাকা দিচ্ছে কেবল তাদেরই গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। আমদানিকারকদের ডেমারেজের দোহাই আর সরবরাহকারীদের কারসাজিতে ৪ কোটি এলপিজি গ্রাহক আজ জিম্মি। আমদানির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কঠোর বাজার মনিটরিং না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এম.এম/সকালবেলা
মন্তব্য করুন