বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি এখনই নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বড় ধরনের ভূমিকম্পের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি না থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘমেয়াদী বিপদ ও প্রস্তুতির বিষয়ে সতর্ক করেছেন তারা। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০টি ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে তিন ধাপের বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ভূতত্ত্ববিদরা।
ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্প চিত্র ইউএসজিএস ও ইএমএসসি-র তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ১০টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩.০ মাত্রা এবং ৩ ফেব্রুয়ারি একই দিনে তিনটি ভূমিকম্প হয়— ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪.১ মাত্রার এবং রাতে মিয়ানমার থেকে পরপর ৫.৯ ও ৫.২ মাত্রার দুটি কম্পন। এরপর ৯, ১০ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি সিলেট ও সুনামগঞ্জে মৃদু কম্পন অনুভূত হয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরার আশাশুনিকে উৎপত্তিস্থল করে ৫.৪ মাত্রার মাঝারি ভূমিকম্পে ঢাকাসহ সারা দেশ কেঁপে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের ৩ ধাপের পরামর্শ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এবং ভূতাত্ত্বিক সমিতির সভাপতি বদরুল ইমাম ভূমিকম্প মোকাবিলায় তিনটি পর্যায়ের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
প্রথম ধাপ (পূর্বপ্রস্তুতি): ভূমিকম্পের আগেই পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করা।
দ্বিতীয় ধাপ (কম্পনকালীন সুরক্ষা): ভূমিকম্প চলাকালে ইনডোর বা আউটডোরে যেখানেই থাকুক না কেন, বাসস্থান, অফিস-আদালত কিংবা রাস্তা যেখানেই হোক, কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে তার সম্যক জ্ঞান থাকা।
তৃতীয় ধাপ (পরবর্তী উদ্ধারকাজ): কম্পন থামার পর নাগরিক হিসেবে উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ এবং কমিউনিটির সঙ্গে মিলে কাজ করা।
ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার মনে করেন, তরুণ সমাজকে সচেতন করতে ‘ন্যাচারাল ডিজাস্টার সারভাইভাল গেম’-এর মতো ডিজিটাল মাধ্যম ও নিয়মিত মহড়া কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, “এর মাধ্যমে তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করা সম্ভব এবং নিয়মিত মহড়া ও অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষের মানসিক মনোবল বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত জানমালের ক্ষয়ক্ষতি নূন্যতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে।”
ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূমিকম্পের উৎস বাংলাদেশ মূলত তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত— ইউরেশিয়ান প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট এবং বার্মা প্লেট। এর মধ্যে ইন্ডিয়া ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই অবস্থিত। এই সংযোগ রেখাটি সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওড় অঞ্চল হয়ে মেঘনা নদী বরাবর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর দিয়ে সুমাত্রা পর্যন্ত বিস্তৃত। দেশের পশ্চিম অংশ ইন্ডিয়ান প্লেটের অন্তর্ভুক্ত এবং পূর্ব অংশটি বার্মা প্লেটের ওপর অবস্থিত। সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চলগুলো মূলত এই দুই প্লেটের পরস্পরমুখী সংঘর্ষের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন— ১) পূর্বের সাবডাকশন জোন: সিলেট থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা; ২) উত্তরের ডাউকি ফল্ট: সিলেটের উত্তর সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চল; ৩) হিমালয়ান ফ্রন্টাল থ্রাস্ট: নেপাল, ভুটান, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে গঠিত হিমালয়ের পাদদেশ।
ঝুঁকির কেন্দ্রে ঢাকা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মধ্যে সাবডাকশন জোন এবং উত্তরে ডাউকি ফল্টে বিপুল পরিমাণ ভূ-গর্ভস্থ শক্তি জমা হয়ে আছে, যা ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরির সক্ষমতা রাখে। বড় ভূমিকম্প এই উৎসগুলোতে আঘাত হানলে বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, তাই এসব অঞ্চলের সক্রিয়তা নিয়ে সজাগ থাকা প্রয়োজন। ড. হুমায়ুন আখতার সতর্ক করে বলেন, “যদিও ঢাকা উৎসস্থল থেকে বেশ দূরে। কিন্তু ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক দিয়ে ঢাকা শীর্ষে রয়েছে। যতগুলা ঝুঁকির জন্য যেসব উপাদান দরকার সেই উপাদানগুলা ঢাকায় বিদ্যমান। অধিক জনসংখ্যা তারপরে এই যে ইমারত সেগুলা রেগুলেশন ফলো করে করা হয়নি।” অন্যদিকে ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, “নাজুক অবকাঠামো পরিহার করে ভূমিকম্প-সহনীয় কনস্ট্রাকশন নিশ্চিত করাই এখন প্রধান কাজ।”
সাতক্ষীরার ভূমিকম্প ও ‘সাবডাকশন জোন’ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সাতক্ষীরায় যে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়েছে, তার উৎসস্থল ছিল পাহাড়ি অঞ্চল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পশ্চিমে। বিশেষজ্ঞরা এই এলাকাটিকে ‘সাবডাকশন জোন’ হিসেবে অভিহিত করেন। ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, ওই নির্দিষ্ট এলাকায় বড় কোনও ভূমিকম্পের স্থায়ী উৎস নেই। ফলে সেখানে মাঝেমধ্যে মৃদু থেকে মাঝারি কম্পন হলেও বড় কোনও বিপদের আশঙ্কা নেই।
ইতিহাসের সতর্কতা উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে সর্বশেষ বড় ধরনের ভূমিকম্প (৭ মাত্রা) হয়েছিল ৯৬ বছর আগে, ১৯৩০ সালে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের চক্র সাধারণত ১০০ বছরের আশেপাশে হয়ে থাকে। নিশ্চিত করে সময় বলা না গেলেও, দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় যেকোনও সময় বড় ঝাঁকুনি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই আতঙ্কিত না হয়ে অবকাঠামোগত ও মানসিক প্রস্তুতি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। তবে বদরুল ইমাম জানান, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ হলেও পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় পড়ে না। তিনি বলেন, “খুব বড় ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি এখনই আছে বলে আমি মনে করি না। এটি একটি বিশ্বব্যাপী ভৌগোলিক ঘটনা, যা পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই ঘটে থাকে।”
আই.এ/সকালবেলা