নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন করা যাবে না। এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কারণে ভোটারদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, বৃদ্ধ ও দূর থেকে আসা ভোটারদের ভোগান্তি হবে। আবার কেউ বলছেন, নির্বাচনে অনিয়ম হলে তা প্রচারে আসবে না। এ কারণে ইসিকে আবারও বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করছেন অনেকেই।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে এই নির্দেশনা জারি করেছে ইসি। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ ব্যবহারকারী দুই জন আনসার সদস্য ছাড়া কেউ মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখতে পারবেন না।
এই সিদ্ধান্তের সমালোচকরা বলছেন, যারা গ্রাম বা দূরবর্তী এলাকা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভোট দিতে আসবেন, তাদের জন্য মোবাইল ফোন ছাড়া থাকা বড় সমস্যা তৈরি করবে। অনেক ভোটারই যাতায়াতের সময় পরিবার বা পরিবহন সংক্রান্ত যোগাযোগের জন্য ফোনের ওপর নির্ভর করেন। বিশেষ করে নারী ভোটার, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থদের ক্ষেত্রে ফোন ছাড়া কয়েক ঘণ্টা ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ইসি বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত। তবে ভোটারদের একটি অংশ মনে করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের দায় ভোটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তাদের মতে, ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশাপাশি ভোটারদের বাস্তব সমস্যাও বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কেউ ভুল করে ফোন নিয়ে এলে প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে জমা রেখে ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, হাজার হাজার ভোটারের ফোন জমা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাস্তবে কতটা সম্ভব এবং এতে আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে না তো?
সব মিলিয়ে, নির্বাচনকে সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ হিসেবে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলেও, দূর থেকে আসা ভোটারদের ভোগান্তি ও উদ্বেগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার ও কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টুসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে কথা বলেছেন অনেকে।
এনসিপির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিয়ে না যাওয়ার কোনও লজিক নেই। এমনটা আগে কখনও দেখিনি। এটার মানে কোনও বিপদ হলেও কল করে কাউকে জানানো যাবে না। অনেকে নিরাপত্তাহীনতার জন্য মোবাইল নিতে না পারলে ভোট দিতেও যাবেন না।
সিসি ক্যামেরা থাকলেও তাৎক্ষণিক কোনও কাজে দেবে না। মোবাইলের মাধ্যমে সাংবাদিকরা যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে, অনিয়ম জালিয়াতির চিত্র দেখাতে পারবে তা ক্যামেরা পারবে না। কেন্দ্র দখল-ভোট চুরি ঠেকাতে ব্যক্তিগত ফোন কার্যকর হবে। সঙ্গে সঙ্গেই ভিডিও রেকর্ড হয়ে যাবে। হয়তো এসব জালিয়াতির ভিডিও কেউ করতে না পারে সে জন্য ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন। এটা সুস্পষ্টভাবে ভোট চুরির সুযোগ করে দেওয়া। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত।
শামসুন্নাহার রুমি নামে একজন সাধারণ নাগরিক ফেসবুকে লেখেছেন, এই যুগে মোবাইল ফোন বাসায় রেখে কি কেউ চলাফেরা করে? তাহলে ভোটাররা মোবাইল ফোন কোথায় রেখে যাবে? আর ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে গেলে নির্বাচন কমিশনের সমস্যা কোথায়? এটা কি বিসিএস পরীক্ষা নাকি ম্যাট্রিক পরীক্ষা? এমনিতেই মানুষজন ভোট দিতে যেতে চায় না। আর আপনারা বলছেন, ফোন রেখে ভোটকেন্দ্রে যেতে। তাহলে ভোটাররা ভোটে দিতে যাবে কেন? আপনাদের যুক্তিটা আসলে কী? এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন। মানুষকে আনন্দের সঙ্গে ভোট দিতে দিন।
আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল এলাউ না করার লজিকটা কী? একটা কেন্দ্রে কোনও গণ্ডগোল ঘটলে যদি সেখানে মোবাইলধারী লোকজন থাকেন তাহলে তাদের ক্যামেরায় অনেক সময় প্রকৃত ঘটনা ধরা পড়ার চান্স থাকে। বুথের ভেতরে মোবাইল এলাউ না করার বিষয়টি ঠিক আছে। কিন্তু বুথের বাইরে, কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল না থাকা মানে কেউ বাড়ি থেকে মোবাইল নিয়েই বের হবে না। তার মানে, পুরা ভোটিং প্রক্রিয়াটা সরকারের কিছু লোক ছাড়া বাকি সবার কাছে ঘোলাটে থাকবে। বেশিরভাগ মিডিয়াই (ইলেক্ট্রনিক অনেকেও) মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে শুট করে। মোবাইল না নিতে দিলে বহু জায়গায় ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনার প্রকৃত বিবরণ এভিডেন্সসহ মানুষের জানার সুযোগ থাকবে না।
নুরুল ইসলাম তৌহিদ নামে এক শিক্ষার্থী বলেছেন, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া যাবে না! আমরা যারা দূর থেকে যাবো তারা মোবাইল ফোনটা কোথায় রেখে যাবে? কোনোকিছু হলে যোগাযোগের মাধ্যম কী? যদি সবগুলা দল মিলে এটা প্রত্যাহারের দাবি না করে তাহলে কোনও দলকেই ভোট দেবো না। দুই-তিন হাজার টাকা খরচ করে এতদূর থেকে গিয়ে ভোট দেবো না। যদি এটা বাতিল না করে ভোট দিতে যাবো না ফাইনাল।
সাইফুল্লাহ নামে একজন লিখেছেন, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি কোথায়? পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্ত আসলে ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার প্রতি অনাস্থাকেই প্রকাশ করে।
এদিকে চিঠিটি প্রকাশের পর থেকে গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। সাংবাদিকরাও মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, চিঠির ভাষা দেখে বুঝা যায়, সাংবাদিকরাও এর মধ্যে পড়বে। তারাও মোবাইল ফোন নিয়ে ঢুকতে পারবেন না। এ জন্য আগে আমরা যে সেকশন থেকে ইস্যু করা হয়েছে সেখানে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা করছি, এ চিঠির মধ্যে সাংবাদিকরা পড়বেন কিনা। চিঠির ভাষা দেখে কিন্তু বোঝা যায় পড়বে। যদি তারা বলেন, না সাংবাদিকের ওপর এটা প্রযোজ্য না, তাহলে আমরা একটা ক্লিয়ারিফিকেশন দিয়ে দেবো। আর যদি সাংবাদিকদেরও ইনক্লুড করা হয় তাহলে আমরা কমিশনে একটু আলাপ করবো।
আইএ/সকালবেলা