যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়ার ভেতরের ১৪ পয়েন্ট
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক:বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে দিয়ে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সমঝোতা চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা প্রস্তুত করেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। টানা ৪০ দিন ধরে চলা ভয়াবহ সামরিক সংঘাত এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা চরম বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি ১৪ পয়েন্টের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ নামের এই মেগা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে বলে গতকালই হোয়াইট হাউস থেকে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আজ সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পারমাণবিক চুক্তি ও বিশ্ব রাজনীতি খতিয়ান’ এবং ‘গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসি, জিওপলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজি ও ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি মনিটরিং উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়ার পয়েন্ট ও অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
আন্তর্জাতিক অফিশিয়াল ট্র্যাকিং খতিয়ান অনুযায়ী, গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে এই নতুন চুক্তির গোপন খসড়া পাঠিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন। গত ৬ মে হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-কে এই মেগা গেমপ্ল্যানের কথা নিশ্চিত করে বলেছিলেন, “আমরা একটি টেকসই সমঝোতা চুক্তির খসড়া ইরানের কাছে হস্তান্তর করেছি এবং আশা করছি খুব দ্রুতই আমরা একটা বড় মীমাংসায় পৌঁছাতে পারব।”
যুক্তরাষ্ট্র খসড়া পাঠানোর পর সেটির জটিল আইনি কন্ডিশনগুলোর ব্যাপারে ইরানকে রাজি করাতে পর্দার আড়ালে ব্যাপক ও নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে মধ্যস্থতাকারী দুই মুসলিম দেশ পাকিস্তান এবং কাতার। দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের টানা দেড় মাসের অক্লান্ত মধ্যস্থতা ও দৌড়ঝাঁপের ফলেই মূলত তেহরান এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরে তাদের চূড়ান্ত সম্মতি জ্ঞাপন করেছে।
যদিও দুই দেশের কোনো পক্ষই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই খসড়ার মূল নথি প্রকাশ করেনি, তবে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ‘এএফপি’ (AFP) চার দেশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে এই প্রস্তাবিত চুক্তির প্রধান প্রধান পয়েন্ট ও আইনি মেথডলজির একটি নির্ভরযোগ্য খতিয়ান প্রকাশ করেছে। পয়েন্টগুলো নিচে সাজানো হলো:
চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই দুই দেশের যাবতীয় সামরিক হামলা ও সহিংস কন্ডিশন তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ থাকা কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালী’ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ মুক্ত করে দেওয়া হবে।
মার্কিন প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে সব ধরণের কঠোর নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। এছাড়া চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য যে ৬০ দিনের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে, এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ইরানের ওপর কোনো নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে না ওয়াশিংটন। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হবে এবং বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে ইরানের যে বিলিয়ন ডলার অর্থ ‘ফ্রিজড’ বা অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে, তা মুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ইরানকে তাদের পরমাণু প্রকল্পের ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া বা সেন্ট্রিফিউজের গতি সম্পূর্ণ থামাতে হবে এবং নতুন কোনো পরমাণু স্থাপনার সম্প্রসারণ বন্ধ রাখার কড়া কন্ডিশন মানতে হবে। এই ৬০ দিনের মেয়াদের মধ্যেই ইরানের বর্তমান ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক উত্তেজনা নিরসনে উভয় দেশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। যুদ্ধের কারণে ইরানের যে বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ এবং দেশ পুনর্গঠন সংক্রান্ত বিশেষ আলোচনা শুরু করা হবে। চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির খসড়া প্রস্তুতের পাশাপাশি এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পুনর্গঠন সহায়তা এবং আঞ্চলিক যৌথ নিরাপত্তা মেথড নিয়ে আলোচনা শুরু করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তির সফল বাস্তবায়ন বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এক বিশাল স্বস্তি এনে দেবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জান্নাত সকালবেলা
|