তেলের দাম স্বাভাবিক হতে লাগতে পারে ‘কয়েক মাস’

তেলের দাম স্বাভাবিক হতে লাগতে পারে ‘কয়েক মাস’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে বাজার স্বাভাবিক হওয়া সহজ হবে না। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস রফতানি হয়। এ ছাড়া পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ফলে হিলিয়াম ও সারের মতো উপজাত পণ্যের দামও আকাশচুম্বী হয়েছে, যা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো চরম সংকটে পড়েছে। টাফটস ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুলের মেরিটাইম স্টাডিজের অধ্যাপক রকফোর্ড ওয়েইট বলেন, বাজার কবে স্বাভাবিক হবে তা এখন বলা অসম্ভব। আমরা বিশ্ব তেলের বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখছি।

তিনি জানান, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। সেখানে বুধবার মাত্র ৫টি এবং বৃহস্পতিবার ৭টি জাহাজ চলাচল করেছে। বাজার স্থিতিশীল হতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তি এবং সৌদি আরব, ভারত ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে গভীর সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে ইরান প্রতিটি জাহাজের জন্য ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ‘টোল’ বা ফি আদায় করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘খবর পাওয়া যাচ্ছে ইরান ট্যাঙ্কার থেকে ফি নিচ্ছে। তাদের এটা করা উচিত নয়, আর যদি করে থাকে তবে এখনই বন্ধ করা উচিত।’ তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ফি তেলের দাম বাড়ার মূল কারণ নয়; বরং বিমা খরচ এবং জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তাই বড় বাধা।

উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ঊষা হ্যালি বলেন, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ স্বাভাবিক হতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করেছেন যে, শান্তি স্থায়ী হলেও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার গত পূর্বাভাসের (৩.৩ শতাংশ) চেয়ে কম হবে।

বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন যে, এই যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার ওপর দেওয়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো কিছুটা শিথিল হয়েছে এবং মস্কো চড়া দামে তেল বিক্রি করার সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে চীনা জাহাজগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে। হ্যালি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী তা নিয়ে আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।’ সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি-র র‍্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, তেলের দাম কমতে হলে ইরাকের মতো দেশগুলোর উৎপাদন পুনরায় শুরু করা জরুরি। ইরাকের প্রতিদিন অন্তত ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও মজুত সংকটে তা বন্ধ ছিল। তবে বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে সেখানে নতুন করে বিনিয়োগ বা উৎপাদন বাড়ানো কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়া এখন কেবল যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হওয়ার ওপরই নির্ভর করছে।

আই.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন