খালেদ সাইফুল্লাহ-এর কলম: নির্বাচনী রাজনীতির এক রহস্যময় প্রবাদ হলো—‘কার পাশা যে শেষ পর্যন্ত কার টেবিলে গিয়ে থামে, তা বোঝা বড় দায়।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এই প্রবাদটিকেই যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এলো। গত কয়েকমাস ধরে রাজপথ থেকে চায়ের আড্ডা—সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের সুশৃঙ্খল ক্যাডার ভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি, প্রতিটি জেলায় জনাকীর্ণ সমাবেশ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আধুনিক প্রচারকৌশল দেখে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এবার বোধহয় ‘দাঁড়িপাল্লা’র পালে বইছে বিজয়ের হাওয়া। কিন্তু ভোটের চূড়ান্ত ‘ব্যালট বিপ্লব’ বলছে ভিন্ন কথা। রাজনীতির দাবার ছকে শেষ চালটি দিয়েছেন সাধারণ ভোটাররা, যার ফলে ‘ধানের শীষ’ এখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আসীন।
৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগহীন নির্বাচনী মাঠে বিএনপি ও জামায়াত ছিল প্রধান দুই শক্তি। তবে ফলাফলের ব্যবচ্ছেদ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর সামনে আসে যা এই নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছে।
নির্বাচনী ফলাফলের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এককভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল করে ৭২টি (৬৮-৭৫ রেঞ্জের মধ্যে) আসন লাভ করেছে।
ভোটের শতাংশ (Vote Share): বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি প্রায় ৪২-৪৫% ভোট নিশ্চিত করতে পেরেছে। অন্যদিকে জামায়াত এককভাবে প্রায় ১৮-২২% ভোট পেলেও ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ (First-past-the-post) পদ্ধতির কারণে ভোটের অনুপাতের সাথে আসনের সংখ্যার ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
ভোটের মেরুকরণ: গ্রামীণ জনপদে বিএনপির ভোটব্যাংক ছিল প্রায় ৪০ বছরের পুরনো ও পরীক্ষিত, যা জামায়াতের ‘রিব্রান্ডিং’ বা নতুন ইমেজের চেয়েও শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ‘গেম চেঞ্জার’ ছিল আওয়ামী লীগের প্রায় ৪ কোটি ভোটারের ভূমিকা। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও তাদের বিশাল ভোটব্যাংক নিষ্ক্রিয় ছিল না।
অস্তিত্ব রক্ষার ভোট: আওয়ামী পন্থী ভোটার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ জামায়াতের ক্ষমতায় আরোহণের সম্ভাবনাকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখেছে। ফলে তারা নিজেদের আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে এসে ‘মন্দের ভালো’ (Lesser of two evils) হিসেবে বিএনপিকে বেছে নিয়েছে। এই বিশাল ‘সুইং ভোট’ (Swing Vote) বিএনপির বাক্সে পড়ায় অনেক দোদুল্যমান আসনেও ধানের শীষ বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে।
জামায়াত সোশ্যাল মিডিয়া এবং শহরকেন্দ্রিক প্রচারে এগিয়ে থাকলেও, বিএনপি তাদের তৃণমূল কাঠামোর ওপর ভরসা রেখেছিল।
তৃণমূলের সংযোগ: গত ১৭ বছর ধরে হামলা-মামলায় জর্জরিত বিএনপির স্থানীয় নেতারা গ্রামের প্রতিটি পরিবারের সাথে যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক (Personal Connection) ধরে রেখেছিলেন, তা ভোটের দিন কাজে দিয়েছে।
ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা: জামায়াত তাদের ভোটব্যাংক বাড়াতে পারলেও, বিএনপির ‘পোলিং এজেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ এবং কেন্দ্র দখলের রাজনীতি প্রতিরোধ করার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি।
জামায়াতের পাশাটি তাদের নিজেদের টেবিলে না গিয়ে থমকে গেছে ‘বিরোধী দল’-এর ঘরে। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
ঐতিহাসিক অবস্থান: স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো ইসলামী দল সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসছে। এর আগে এরশাদ বা রওশন এরশাদের জাতীয় পার্টি যে ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে, জামায়াত সেখান থেকে বেরিয়ে একটি শক্তিশালী ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ (Shadow Cabinet) গঠন করার সক্ষমতা রাখে।
ওয়াচ-ডগ ভূমিকা: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলেও, সংসদে জামায়াতের ৭২ জন এমপি সরকারের প্রতিটি বিল ও নীতির কড়া সমালোচনা করার ক্ষমতা রাখবেন, যা একটি কার্যকরী গণতন্ত্রের জন্য শুভলক্ষণ।
রাজনীতির পাশা খেলা বড়ই নিষ্ঠুর। যেখানে প্রচারণার পারদ আকাশচুম্বী থাকলেও চূড়ান্ত ডিক্রি আসে ব্যালট বাক্সে। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী জেনারেশন-জি (Gen-Z) এর আকাঙ্ক্ষা এবং সনাতন রাজনীতির মিশেলে ভোটাররা একটি ভারসাম্যপূর্ণ রায় দিয়েছেন। ক্ষমতার টেবিলটি বিএনপির, আর রাজপথের লড়াকু বিরোধী দলের আসনটি জামায়াতের। এখন দেখার বিষয়, একক আধিপত্যের সরকার এবং শক্তিশালী আদর্শিক বিরোধী দল মিলে আগামীর বাংলাদেশকে কোন পথে নিয়ে যায়।