বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষা: শিক্ষামন্ত্রী

প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০২:৫৫ অপরাহ্ণ
বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষা: শিক্ষামন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক:জাতীয় বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও টেকসই শিক্ষার বুনিয়াদ গড়তে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় মেথডলজি টেনে বলেছেন, “২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে মূলত তিনটি বিষয়কে। আর সেই গোল্ডেন তিনটি বিষয়ই হলো—প্রথমত শিক্ষা, দ্বিতীয়ত শিক্ষা এবং তৃতীয়তও শিক্ষা।” আজ রবিবার (১৪ জুন) দুপুরে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF) আয়োজিত শিক্ষা বিষয়ক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই খতিয়ান তুলে ধরেন।

আজ রবিবার দুপুরে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘শিক্ষা ও একাডেমিয়া, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ইউনেস্কো পলিসি খতিয়ান’ এবং ‘প্রাথমিক কারিকুলাম, পেডাগজি মেথড ও চাইল্ড রাইটস প্রোটেকশন উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের সংস্কার ও প্রাথমিক শিক্ষার ৫ বছর মেয়াদি গেমপ্ল্যান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

রাজধানীর হোটেল শেরাটনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ এডুকেশন সেক্টর অ্যানালাইসিস’ (ESA) শীর্ষক এই কর্মশালার আনুষ্ঠানিক খতিয়ান অনুযায়ী, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ইউনিসেফের সাম্প্রতিক জরিপ রিপোর্টের কন্ডিশন উল্লেখ করে বলেন, “আমাদের দেশে প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু এখনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রয়েছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, মাধ্যমিক স্তরে এই স্কুলছুট বা ঝরে পড়ার হার ১৩ শতাংশেরও বেশি। সামগ্রিক পরিসংখ্যানের বিচারে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পড়ার বয়সি প্রায় ৪০ লাখ শিশু-কিশোর বর্তমানে সম্পূর্ণ শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে অবস্থান করছে।”

তিনি আরও জানান, এই ঝরে পড়া শিশুদের মাঝে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের সংখ্যা অনেক বেশি, যা ২০২২ সালের খতিয়ানের তুলনায় ২০২৬ সালে এসে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বার্থে সরকার এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অ্যাকশন প্ল্যান শুরু করেছে এবং নতুন বাজেটে এর জন্য বড় ধরণের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কর্মশালায় ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স আইনি ও মানবিক কন্ডিশন টেনে বলেন, “দরিদ্র পরিবারের শিশু, শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় বা দুর্গম অঞ্চলের শিশুরা শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত করতে বিশেষ মেথড প্রয়োজন।”

কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী ও বৈপ্লবিক রূপরেখা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, “খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আধুনিক প্রি-প্রাইমারি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হবে। আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে সারাদেশের শতভাগ স্কুলে ‘মিড-ডে মিল’ (দুপুরের খাবার) চালুর চূড়ান্ত পরিকল্পনা আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। আমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশ এমন কন্ডিশনে নিয়ে যেতে চাই, যাতে বিত্তবান ও সাধারণ—সবাই নিজ সন্তানদের সেখানে ভর্তি করতে আগ্রহী হয়।”

প্রাথমিক শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ আরও বলেন, “আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ডাবল শিফট থেকে পুরোপুরি ‘সিঙ্গেল শিফটে’ নিয়ে আসার ডেডলাইন নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো ধরণের আধুনিক ও পেশাদার প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষক যেন ক্লাসরুমে পাঠদান (Teaching) করতে না পারেন, সেই মেথড ধীরে ধীরে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।” তিনি জানান, প্রাথমিক শিক্ষার গুনগত মান বাড়াতে প্রধানত ৪টি পিলার বা বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; তা হলো—কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক অবকাঠামো ও পরিবেশ এবং দক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ তাঁর বক্তব্যে দেশের শিশু কিশোরদের মানসিক বিকাশের জন্য আরও দুটি বড় খতিয়ান সামনে এনেছেন। তিনি ঘোষণা করেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের প্রাথমিক স্তরে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ২০২৮ সালের পরিমার্জিত চূড়ান্ত কারিকুলামে প্রাথমিক শিক্ষায় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা হবে ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ উইং।

একই সাথে, প্রাথমিক শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতি ও তদবির কালচার রোধে শিক্ষকদের বদলি (Transfer) প্রক্রিয়ায় এক আমূল প্রশাসনিক সংস্কারের গেমপ্ল্যান আনা হচ্ছে। শিক্ষকদের বদলির সম্পূর্ণ আইনি ও নির্বাহী দায়িত্ব কেন্দ্রীয় অধিদপ্তর থেকে সরিয়ে সরাসরি স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের হাতে ন্যস্ত করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে বলে কর্মশালার খতিয়ানে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন