শিক্ষা প্রশাসনে গতিশীলতা আনতে মাউশি মহাপরিচালকের উদ্যোগ
অনক আলী হোসেন শাহিদী, বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি এ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও স্থবিরতা কমিয়ে সেবা কার্যক্রমকে আরও দ্রুত, কার্যকর ও জনবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
তাঁর উদ্যোগের অন্যতম দিক হলো প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। সেবা প্রক্রিয়া সহজ করতে পরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সেবা দ্রুত দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
একই সঙ্গে মাউশির প্রশাসনিক কার্যক্রমে ডিজিটাল অটোমেশন জোরদার এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্য পদ্ধতি (EMIS) আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিঠি, নথি ও গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট হারিয়ে যাওয়া বা ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের ঝুঁকি কমাতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। EMIS-এর তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্লাউড মাইগ্রেশন ও সিকিউরিটি অডিটের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বছরব্যাপী ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, দাবা, সাঁতারসহ বিভিন্ন খেলাধুলা এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও আধুনিক শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে মাউশি। শিক্ষকদের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে অনলাইন প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সচেতনতামূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইউনিসেফ বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও তাঁর উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা, পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাউশির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অধিদপ্তরের আওতায় ২২,৫৬৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৪,১২,৫২৬ জন শিক্ষক এবং ১ কোটি ৩৮ লাখ ৪০ হাজার ১৬৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এত বিশাল একটি শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি, তথ্যের নিরাপত্তা, জবাবদিহিতা এবং মাঠপর্যায়ে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় মহাপরিচালকের বিকেন্দ্রীকরণ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার উদ্যোগকে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে মহাপরিচালকের বক্তব্য: এ বিষয়ে মহাপরিচালক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ দেশের শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বিশেষ করে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করতে ১৯৭৭ সালে জাতীয় পে-স্কেল এবং ১৯৮০ সালে অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের মতো শিক্ষকদের অভিন্ন চাকরিবিধি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিক্ষকদের মৌলিক মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারিগরি ও পেশাগত শিক্ষা বাস্তবায়নের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর সেই মহান পথ ধরেই শিক্ষকরা আজ তাঁদের পেশাকে প্রতিষ্ঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন।”
ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের দায়িত্বকালের উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শিক্ষা প্রশাসনকে আরও গতিশীল, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, ডিজিটাল অটোমেশন, EMIS আধুনিকায়ন, তথ্য নিরাপত্তা, সহশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদারের উদ্যোগ শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব উদ্যোগের স্থায়ী সাফল্য নির্ভর করবে ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ সেবা প্রাপ্তির ওপর। বিশাল এই শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে মাউশির প্রশাসনিক কাঠামো আরও কার্যকর ও আধুনিক হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট মহলের।
নিক নেম: এআইএল/সকালবেলা