ইবোলা ভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায়
স্বাস্থ্য ডেস্ক: বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের আরেক নাম ইবোলা ভাইরাস। এটি একটি অত্যন্ত বিরল এবং মারাত্মক সংক্রামক ভাইরাস, যা ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ (ইভিডি) বা ‘ইবোলা হেমোরেজিক ফিভার’ নামক প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি করে। ইতোমধ্যেই এই ভাইরাসের ভয়াবহতা বিবেচনা করে একে গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি বলে ঘোষণা করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও/হু)।
বিশেষ করে আফ্রিকা মহাদেশের কঙ্গো এবং উগান্ডায় ইবোলা সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টিকে ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দিন দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মারণঘাতী ভাইরাস। প্রাথমিকভাবে, মানুষ থেকে মানুষে বা সংক্রমিত বন্যপ্রাণী থেকে মানুষের শরীরে নির্গত তরলের মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার অনেক বেশি।
ইবোলা ভাইরাস এটি একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা মূলত মেরুদণ্ডী প্রাণী থেকে প্রাকৃতিকভাবে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং তীব্র রোগ সৃষ্টি করে। মানুষের দেহে প্রবেশের পর এটি জ্যামিতিক হারে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে যেতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ। ইবোলা ভাইরাসের অন্যতম বিরল ও অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি প্রজাতি হচ্ছে ‘বুন্দিবুগ্য ভাইরাস’। এটি মানবশরীরে প্রবেশ করলে তীব্র ভাইরাল হেমোরেজিক জ্বর সৃষ্টি করে, যা যেকোনো মানুষের জন্য দ্রুত প্রাণঘাতী হতে পারে।
ইবোলা ভাইরাস যেহেতু এটি একটি জুনোটিক ভাইরাস, তাই কোনো না কোনো বন্যপ্রাণীর শরীর থেকেই এই ভাইরাস প্রথম মানবদেহে প্রবেশ করে। বন্য বাদুড়, বিশেষত ফলখেকো বাদুড়কে (ফ্রুট ব্যাট) এই ভাইরাসের প্রধান প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে মনে করা হয়। এছাড়া, সংক্রমিত শিম্পাঞ্জি, গোরিলা, বানর, হরিণ বা ওই জাতীয় কোনো বন্যপ্রাণীর রক্ত, মাংস বা শরীরের অন্য কোনো তরলের সরাসরি সংস্পর্শ থেকেও এই ভাইরাসের জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
একবার মানুষের শরীরে ছড়ানোর পর এটি অন্যান্য সুস্থ মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, মল, মূত্র, বুকের দুধ বা বীর্যের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এবং তা সুস্থ ব্যক্তির ত্বকের কোনো কাটা অংশ বা চোখ, নাক ও মুখের শ্লেষ্মা ঝিল্লির (মিউকাস মেমব্রেন) মাধ্যমে ভেতরে প্রবেশ করলে এই ভাইরাস ছড়ায়। fragile আক্রান্ত রোগীর ব্যবহৃত কাপড়, বিছানাপত্র, সুঁই বা যেকোনো চিকিৎসা সরঞ্জামের মাধ্যমেও এই রোগ অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইবোলা এই ক্ষতিকর ভাইরাসটি মানবশরীরে প্রবেশ করার পর মোটামুটি তিন সপ্তাহ পর্যন্ত কোনো লক্ষণ ছাড়াই চুপচাপ বংশবৃদ্ধি করতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গড়ে ২ থেকে ২১ দিনের মাথায় রোগীর শরীরে লক্ষণ প্রকাশ পায়। ভাইরাসের এই সুপ্ত অবস্থাকে বলা হয় ইনকিউবেশন পিরিয়ড (Incubation Period)।
এর প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে রোগীর শরীরে তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা, তীব্র মাথা ব্যথা ও গলা ব্যথা শুরু হয়। রোগটি আরেকটু বাড়লে বমি, ডায়ারিয়া, পেট ব্যথা এবং শরীরের ভেতরে কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে শুরু করে। অনেক জটিল ক্ষেত্রে রোগীর শরীরের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ (Internal and External Bleeding) শুরু হয়ে যায়। এ সময় রোগীর বমি এবং মলের সঙ্গে রক্তপাত দেখা যায়। পাশাপাশি নাক, মাড়ি, চোখ এবং যৌনাঙ্গ থেকেও অনিয়ন্ত্রিত রক্ত বের হতে পারে। একই সঙ্গে রোগীর তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়। তাই এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে আইসোলেশনে নিয়ে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হয়।
এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করার মতো এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যকরী অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ তৈরি হয়নি। এমনকি সাধারণ মানুষের জন্য এই রোগের কোনো সর্বজনীন টিকামুক্ত বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। তাই রোগ দ্রুত শনাক্ত হওয়ার পর রোগীকে অনতিবিলম্বে হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি রোগীর শরীরে দেখা দেওয়া লক্ষণ অনুযায়ী (যেমন: তরলের অভাব পূরণে স্যালাইন, রক্তক্ষরণ বন্ধের ব্যবস্থা ইত্যাদি) চিকিৎসা দেওয়া হয়। সঠিক সময়ে সঠিক সাপোর্টিভ কেয়ার বা সেবা পেলে অনেক রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
|