তিউনিসিয়ায় ইসলামের আগমন ও বিস্তারের ইতিহাস

প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:৪৯ অপরাহ্ণ
তিউনিসিয়ায় ইসলামের আগমন ও বিস্তারের ইতিহাস

ধর্ম ডেস্ক:সপ্তম শতাব্দীর দিকে বিশ্ব মানচিত্রে যখন নতুন এক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইসলামের উত্থান ঘটছিল, তখন সমগ্র উত্তর আফ্রিকাজুড়ে প্রাচীন খ্রিষ্টধর্ম এবং রোমান আধিপত্য এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাত-পরবর্তী সময়ে দামেস্কভিত্তিক শক্তিশালী উমাইয়া খিলাফতের হাত ধরে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের প্রসারে এক নতুন আইনি কন্ডিশন তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় উমাইয়া রাজবংশের প্রতিনিধি এবং আরব মুসলিম সেনাপতি উকবা ইবনে নাফে ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে এক বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ে তৎকালীন রোমান প্রদেশ আফ্রিকায় (আরবিতে যা ইফ্রিকিয়া নামে পরিচিত) প্রবেশ করেন। তাঁর এই দূরদর্শী অভিযানের মাধ্যমেই তিউনিসিয়ার বুকে চিরতরে বদলে যায় জেন্ডার, সমাজ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রাচীন সমীকরণ।

আজ সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিশ্ব ধর্মীয় ইতিহাস, মাগরেব কালচার ও ঐতিহ্য খতিয়ান’ এবং ‘ইসলামিক হেরিটেজ ট্র্যাকিং, জিলোট অ্যান্ড ট্রাইবাল রেজিস্ট্রি ও মিডল ইস্ট হিস্ট্রি মনিটরিং উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে তিউনিসিয়ায় ইসলামের আগমন ও রাজবংশগুলোর উত্থান-পতনের মেথড বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

ঐতিহাসিক মিলিটারি ট্র্যাকিং খতিয়ান অনুযায়ী, তিউনিসিয়ায় মুসলিম বাহিনীর বিজয় সুসংহত করতে সেনাপতি উকবা ইবনে নাফে কায়রোয়ান (যার অর্থ দুর্গ) শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন। উপকূল ও পাহাড়ের মধ্যবর্তী এই কৌশলগত অবস্থান বেছে নেওয়ার মূল গেমপ্ল্যান ছিল কার্থেজিয়ান ও রোমানদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত তিউনিসিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসিত বারবার উপজাতিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। শুরুতে কুসাইলার নেতৃত্বে খ্রিষ্টান বারবার বাহিনী আরব মুসলিমদের প্রতিরোধ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়।

পরবর্তীতে খলিফা আবদুল মালিকের শাসনামলে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামী বিজয় এক নতুন মাত্রা পায় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল কার্থেজ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে জারাওয়া উপজাতির এক দুর্ধর্ষ নারী দিহিয়া—যাঁকে আরবরা ‘আল-কাহেনা’ বা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বলে ডাকত—তিনি আরবদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং ৬৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তেবেসায় আরবদের পরাজিত করেন। শেষ পর্যন্ত আল-জেম নামক স্থানে আল-কাহেনা নিহত হলে বারবারদের প্রতিরোধ কন্ডিশন ভেঙে পড়ে।

রাজনৈতিক বিবর্তন খতিয়ানে দেখা যায়, ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে ইফ্রিকিয়ায় চরম অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। এই কন্ডিশনে শান্তি ফিরিয়ে আনেন ইব্রাহিম ইবনে আল-আঘলাব, যার ফলে ৮০০ থেকে ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই অঞ্চলে আঘলাবিদ রাজবংশের শাসন বজায় থাকে। এদের আমলে উন্নত সেচ ব্যবস্থা এবং সাহারা মরুভূমির নতুন বাণিজ্যিক মেথডলজির কারণে জলপাই চাষ ও অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি হয়। তবে নতুন বারবার মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে আঘলাবিদরা মালেকি মাজহাবের অনুসারীদের কাছে জনপ্রিয়তা হারায়।

একই সময়ে পার্সিয়ান বংশোদ্ভূত ইমাম আবদুর রহমান ইবনে রুস্তমের হাত ধরে আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া সীমান্তে রুস্তমিদ নামক একটি ধর্মতাত্ত্বিক বা থিওক্রেসি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, যা ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। পরবর্তীতে ইয়েমেনের উবায়দুল্লাহ আল-মাহদির হাত ধরে শিয়া মতবাদের ফাতিমিদ বংশের উত্থান ঘটে। তারা কুতামা বারবারদের সমর্থনে ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোয়ান ও রুস্তমিদ রাজ্যের পতন ঘটায় এবং মাহদিয়াকে নতুন রাজধানী করে। তবে সুন্নি মালেকি মুসলমানরা শিয়া ফাতিমিদদের কঠোর কর ব্যবস্থা সহজে মেনে নেয়নি। ৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে মিশর বিজয়ের পর ফাতিমিদরা কায়রোতে আল-আজহার মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে পাকাপাকীভাবে মিশরে চলে গেলে ইফ্রিকিয়ার শাসনভার স্থানীয় বারবার রাজবংশ জিরিডদের হাতে চলে যায়।

সর্বশেষ জিলোট ও সমাজতাত্ত্বিক খতিয়ান অনুযায়ী, ১১৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সিসিলির নরম্যানরা মাহদিয়া দখল করলে উত্তর আফ্রিকায় চরম সংকট তৈরি হয়। এই কন্ডিশন দূর করতে মরক্কোর ইবনে তুমার্তের হাত ধরে আলমোহাদ রাজবংশের কঠোর একত্ববাদী আন্দোলন শুরু হয়। আলমোহাদ খলিফা আবদ আল-মুমিন নরম্যানদের পরাজিত করে তিউনিস দখল করেন এবং প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ মাগরেব অঞ্চলকে একক মেথডে ঐক্যবদ্ধ করেন।

আলমোহাদ সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে ১২৩০ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেয় হাফসিদ রাজবংশ (১২৩০-১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দ), যা তিউনিসিয়ার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে চিহ্নিত। হাফসিদ আমির আল-মুস্তানসিরের আমলে তিউনিসিয়া, মাহদিয়া ও জারবা বন্দরগুলোর আধুনিকায়ন ঘটে এবং ইউরোপের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ চমৎকার রূপ নেয়। এই হাফসিদ আমলেই মালেকি মাজহাব পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ইসলামের ‘মাসলাহা’ বা জনস্বার্থ ধারণার ওপর ভিত্তি করে এক উদার ও আধুনিক আইনি মেথডলজি তৈরি করা হয়, যা তিউনিসিয়ার সমাজকে আজও প্রভাবিত করে। অবশেষে ১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি উসমানীয় (Ottoman) বাহিনী তিউনিস জয় করলে হাফসিদ রাজবংশের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অবসান ঘটে এবং তিউনিসিয়া উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি কড়া প্রশাসনিক কন্ডিশনে রূপান্তরিত হয়।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন