দেশে বাড়ছে সমকামিতা, প্রতিরোধের আহ্বান শীর্ষ আলেমদের

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ণ
দেশে বাড়ছে সমকামিতা, প্রতিরোধের আহ্বান শীর্ষ আলেমদের
বিশেষ প্রতিবেদন: আমিরুল ইসলাম লুকমান >> অভিশপ্ত এক যৌনাচার সমকামিতা। মানবসভ্যতা ও নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংসকারী এক চরম বিকৃত যৌনাচার। নিকৃষ্ট এই পন্থা পৃথিবীর সৌন্দর্য-শুভ্রতাকে নোংরামির স্তূপে পরিণত করছে। বিকৃত রুচি, নষ্ট মানসিকতা ও খোদাদ্রোহী ইবলিসের অনুসারীরা জঘন্য যৌনাচারকে দুনিয়াময় ছড়িয়ে দিতে হিংস্র থাবা বিস্তার করেছে। পৃথিবীর কোনো সুস্থ-সভ্য মানুষ সমকামিতাকে মেনে নিতে পারে না। কুরআন-হাদিসে সমকামিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা সমকামিতার অপরাধে একটি জাতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তাদের জঘন্য পাপের চিহ্ন এখনো পৃথিবীতে বিদ্যমান আছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে আশঙ্কাজনকভাবে সমকামীদের দৌরাত্ম্য ও নানামুখী তৎপরতা বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের হাতে সমকামীদের আটকের ঘটনা গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশ পাচ্ছে। গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ আরটিভির সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে এক সমকামী জুটিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সমকামী দুই তরুণীর একজন বিবাহিত এবং তার একটি সন্তানও রয়েছে।  গত ১৪ মে ২০২৬ দৈনিক ইত্তেফাক সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসে সমকামিতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগে চার শিক্ষার্থীর আবাসিক সিট বাতিল করা হয়েছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছে। জানা গেছে, আটক একজন শিক্ষার্থী এইডসে আক্রান্ত। অপরদিকে গত ১০ এপ্রিল ২০২৬ দৈনিক কালবেলা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে বেশ কয়েকজন সমকামীকে পিটিয়েছে সাধারণ জনতা। প্রতি শুক্রবার শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামীরা আড্ডা দেন। তারা সেখানে জড়ো হলে সাধারণ মানুষ তাদের ওপর চড়াও হয়। অপরদিকে গত ৫ জুন ২০২৬ জাগো নিউজ জানিয়েছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫৪৬ জন এইডস রোগীর মধ্যে বেশিরভাগই সমকামী ও যৌনকর্মী।
দেশের এই চরম নৈতিক অবক্ষয় ও সমকামিতার বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ও সচেতন উলামায়ে কেরাম। সমকামীদের বিস্তার রোধ ও সমকামের ক্ষতি সম্পর্কে আপামর ধর্মপ্রাণ জনগণকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।  
রাজধানীর বাড্ডার মিফতাহুল উলুম মাদরাসার প্রধান মুফতি মাওলানা আব্দুল মজিদ বলেন, "পৃথিবীর কোনো ধর্মে সমকামিতা বৈধ নয়। সমকামিতা আধুনিক ভোগবাদী ও নৈতিকতাহীন সমাজের এক বড় অভিশাপ, যা তরুণ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সমকামিতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের গড় আয়ু সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক কম হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের গড় আয়ু যেখানে ৬৫ থেকে ৬৭ বছর, সেখানে এই বিকৃত অভ্যাসে লিপ্ত ব্যক্তিদের গড় আয়ু মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে নেমে আসে। এছাড়া এর ফলে পৃথিবীতে মানব বংশবৃদ্ধির ধারা ব্যাহত হবে, যা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যই স্পষ্ট হুমকি। তাই জনস্বাস্থ্য ও সমাজ রক্ষায় এর ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা জরুরি।"
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর জামিয়া মাহমুদিয়া মাদরাসার প্রধান মুফতি রেজাউল করিম আবরার বলেন, "ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী সমকামিতা প্রমাণিত হলে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে (তিরমিজি: ১৪৫৬)। সমকামীদের আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার কথাও হাদিসে বর্ণিত আছে।  (বায়হাকি/শুআবুল ঈমান : ৫৩৮৯)। তবে এই শাস্তি অবশ্যই কেবল ইসলামি রাষ্ট্রের আইন ও বিচার বিভাগের মাধ্যমেই কার্যকর হতে হবে, সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না। একই সাথে সমকামিতাকে কেউ যদি মনে-প্রাণে বৈধ মনে করে, তবে তার ঈমান থাকবে না। তাই মুসলমানদের এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন থাকা উচিত।"
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাওলানা আব্দুল্লাহ আল ফারুক সমকামীদের উত্থানের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, "ইসলাম ও সুস্থ সমাজব্যবস্থায় যা জঘন্য অপরাধ, পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলো সমাজ ধ্বংস করতে সেটাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে লেগে থাকে। এদেশে যারা পশ্চিমা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তারাই সমকামীদের মূল পৃষ্ঠপোষক। কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি, সংস্থা, এনজিও, মিডিয়া এবং উচ্চপদস্থ কিছু ইসলামবিদ্বেষী শক্তি সমকামীদের অর্থ ও আইনি সাহস জুগিয়ে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে।"
রাজধানীর মিরপুরের জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম (আকবর কমপ্লেক্স) মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি মাসুম বিল্লাহ তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, "পরিবারে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা জোরদার করতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই লজ্জাশীলতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিতে হবে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের মানসিক অবস্থা, বন্ধু নির্বাচন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কড়া ও দায়িত্বশীল নজর রাখা, যেন তারা কোনো অশ্লীল অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা বিভ্রান্তিকর গোষ্ঠীর খপ্পরে না পড়ে। পাশাপাশি, যারা ইতিমধ্যে সমকামিতার যৌন স্খলনে আক্রান্ত হয়েছেন, সহমর্মিতা, সঠিক দাওয়াহ, কাউন্সিলিং এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে।"
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে সমকামিতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সৌদি আরব, সুদান, ইয়েমেন, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, কাতারসহ বেশ কয়েকটি দেশে সমকামিতার রাষ্ট্রীয় শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এছাড়া রাশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিস্তিন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশে এটি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোতেও সমকামিতা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। দেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সাথে যৌন সঙ্গম করে, তবে তাকে আজীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং আর্থিক জরিমানায় দণ্ডিত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
দেশ, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সমকামিতার মত নৈতিক পতন থেকে রক্ষা করতে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক, অভিভাবক এবং সরকারকে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম।

মন্তব্য করুন