মহসিন মিয়া, নেত্রকোনা প্রতিনিধি: সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী) আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে রাজনীতিতে এক আলোচিত প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। দীর্ঘ ১৭ বছর কারাবাসের পর জনসমক্ষে ফিরে এসে এমন ঐতিহাসিক জয় অনেকের কাছেই ‘রাজকীয় প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে প্রায় সোয়া লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। মোট ১৪৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে একটি ছাড়া সবকটিতেই তাঁর নিরঙ্কুশ প্রাধান্য দেখা গেছে। এই বিপুল ব্যবধান শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং এটি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, আস্থা ও রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং টানা কারাবাস—এই দুই কঠিন অধ্যায় অতিক্রম করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও বিজয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একসময় তিনি নিজেও সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়। তবে এবারের গণরায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুনভাবে শক্ত ভিত দিয়েছে।
নির্বাচনের পর জনমনে এখন একটি বড় প্রশ্ন—এই ঐতিহাসিক জয়ের মর্যাদা রেখে তিনি কি সকলের আস্থা অটুট রাখতে পারবেন? অতীতে এলাকায় তাঁর উদার ও দানশীল ভাবমূর্তি ছিল আলোচিত। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ভাবমূর্তি কতটা ধরে রাখতে পারবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে একাধিকবার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন লুৎফুজ্জামান বাবর। তাঁর বক্তব্য, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। দীর্ঘ সময় তিনি নিজেই নানা প্রতিকূলতার শিকার হয়েছেন; তাই রাজনৈতিক কারণে কাউকে হয়রানির শিকার হতে দেবেন না। দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক তাঁর কাছে সমান গুরুত্ব পাবেন—এমন আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে সহায়তা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সময়ের দাবি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন, উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা চালু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকেও অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে জোরালো আলোচনা রয়েছে—এই বিপুল জয়ের পর তাঁকে আবারও মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। যেহেতু তিনি অতীতে অত্যন্ত সফলভাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই তাঁর সেই পূর্ব অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করতে পারবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা থাকায় তাঁর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক মহলেই নয়, লুৎফুজ্জামান বাবরকে আবারও মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ইতোমধ্যে দাবির ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ ও নেটিজেনরা ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর মন্ত্রিত্ব পাওয়ার বিষয়ে ব্যাপক সমর্থন ব্যক্ত করছেন। নেত্রকোনা-৪ আসনের জনগণ উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন মূল চ্যালেঞ্জ—এই আস্থাকে সুশাসন ও কার্যকর নেতৃত্বে রূপান্তর করা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে এসে লুৎফুজ্জামান বাবরের সামনে সুযোগ এসেছে নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করার। রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের গল্প অনেক আছে; তবে জনগণের প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে এই ‘রাজকীয় প্রত্যাবর্তন’কে টেকসই সাফল্যে রূপ দেওয়াই হবে তাঁর প্রকৃত অর্জন।
এম.এম/সকালবেলা