বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ভারতের সুতা ও পোশাক ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ভারতের সুতা ও পোশাক ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভারতের টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্য রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ শুল্ক থাকায়, বাংলাদেশকে টপকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাওয়ার আশা করেছিলেন তাঁরা। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চুক্তিতে সেই হিসাব নড়বড়ে হয়ে গেছে। ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দু এ খবর জানিয়েছে।

কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব চন্দ্রিমা চ্যাটার্জি বলেন, ‘আমি আশঙ্কা করছি, এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে ভারতীয় তুলার বাজারের ওপর। কারণ, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা কিনে নিজেদের টেক্সটাইল কারখানায় সুতা তৈরি করতে পারবে।এর ফলে ভারতের তুলা রফতানির বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়বে।’

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী, ‘যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকপণ্য বিনাশুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে। এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানির একটি নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। তবে এই পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানিকৃত টেক্সটাইলের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ১৪৭ কোটি ডলারের সুতা রপ্তানি করেছে। এই সুতার পরিমাণ ছিল ৫৭ কোটি কেজি। বাংলাদেশ ভারতীয় সুতার সবচেয়ে বড় বাজার। গত বছর ভারত বাংলাদেশে ১২–১৪ লাখ বেল তুলা পাঠিয়েছে। উল্লেখ্য, ১ বেল তুলার ওজন প্রায় সাড়ে ৩ মণ। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। ভারতের তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানির ২৬ শতাংশও যায় যুক্তরাষ্ট্রে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর ভারতের টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ আবারও সামনে এসেছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক থাকায়, বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে আশা ছিল, তা এখন অনিশ্চিত।

চুক্তির শর্তে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করবে, যাতে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট পরিমাণ টেক্সটাইল ও পোশাকপণ্য বিনাশুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারে। এই পরিমাণ নির্ধারিত হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানিকৃত টেক্সটাইল ইনপুটের সঙ্গে মিলিয়ে। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও এমএমএফ টেক্সটাইল উপকরণ।

তিরুপ্পুর এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম সুব্রামানিয়ান বলেন, ‘বাংলাদেশের একজন রফতানিকারক ১০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করেও দাবি করতে পারে যে তিনি ১০০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করেছেন। কাঁচামালের উৎস বা ট্রেসেবিলিটি যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নির্ধারণ করবে? বাংলাদেশ যেহেতু পোশাক খাতে খুব শক্ত অবস্থানে আছে, তাই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারি।’

ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের টেক্সটাইল-বিষয়ক জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান সঞ্জয় কে জৈন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাক আমদানি আরও বাড়বে। এতে তৈরি পোশাক এবং গজ কাপড়—দুই ধরনের পণ্যই থাকবে। শতভাগ তুলাজাত পণ্য, যেমন, টি-শার্ট ও নারীদের টপসে ভারত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

তবে কিছু অংশীজন মনে করেন, প্রভাব খুব বেশি নাও হতে পারে। এক পোশাক রপ্তানিকারক বলেন, বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিলগুলো সংকটে আছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা কিনে তৈরি সুতার বাজারে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতার মধ্যেই পড়তে হবে।

কটন টেক্সটাইলস এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সিদ্ধার্থ রাজাগোপাল বলেন, ‘বাংলাদেশ তুলা উৎপাদন করে না, ম্যানমেড ফাইবারও তৈরি করে না। ১৯ শতাংশ শুল্ক মওকুফ পেতে হলে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকেই সুতা বা তুলা কিনতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আনতে যে সময় লাগে, পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচও বিবেচনায় নিতে হবে। তা ছাড়া, সব পণ্য আমেরিকান তুলা দিয়ে বানানো যায় না। তাই পণ্যের ধরন বদলাতে হবে। সরবরাহ শৃঙ্খলও নতুন করে সাজাতে হবে। এটি এক রাতের মধ্যে হবে না। সবকিছুতেই সময় লাগবে। এটি ২০০০ সালের আগে যে কোটা ব্যবস্থা ছিল, সেদিকেই ফিরে যাওয়ার মতো।’

আই.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন