আজ মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল ৫টা ৩ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘রাজধানী’ ও ‘সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধ’ বিভাগের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই মর্মান্তিক ঘটনার আদ্যোপান্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
পল্লবী থানা পুলিশ জানায়, গত রবিবার (৩১ মে) স্থানীয় প্রতিবেশীরা ওই বন্ধ ফ্ল্যাট থেকে তীব্র পচা দুর্গন্ধ পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে ফোন করে সাহায্য চান। পরে খবর পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে ওই বৃদ্ধার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। তবে তিনি ঠিক কতদিন আগে এবং কী অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে মারা গেছেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, পুরো বাসাটি ছিল চরম নোংরা, অগোছালো এবং বসবাসের অযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো মানুষের নিয়মিত যাতায়াত ছিল না। পুলিশ জানায়, উদ্ধার করার সময় মরদেহটি এতটাই পচে গিয়েছিল যে তাতে অসংখ্য পোকা ধরেছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েকদিন আগে তীব্র ক্ষুধা, তৃষ্ণা কিংবা বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে একা ঘরেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আসল কারণ জানতে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছে।
তদন্তে নেমে ওই বৃদ্ধার সন্তানদের সামাজিক ও পেশাগত রাজকীয় পরিচয় পেয়ে খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাও রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন, “নুরজাহান বেগম যে নোংরা ফ্ল্যাটটিতে একাকী পড়েছিলেন, সেটি মূলত তাঁর নিজের মেয়ের বাসা। সেখানে তিনি মাঝেমধ্যে মেয়ের সাথে থাকতেন বলে জানা গেছে। তবে ঘটনার সময় সেখানে কেউ ছিল না।”
ওসি আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, নিস্তব্ধ ঘরে একা পচে মরে যাওয়া এই নুরজাহান বেগমের এক ছেলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন উচ্চপদস্থ ‘যুগ্ম সচিব’ (Joint Secretary) হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর আরেক ছেলে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন সম্মানিত শিক্ষক। শুধু তাই নয়, বৃদ্ধার মেয়েজামাতাও দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন।
সমাজে এত বড় মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে থেকেও নিজেদের বৃদ্ধা মাকে এমন নরকসম নোংরা ও পরিত্যক্ত ঘরে একা ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনায় সন্তানদের কঠোর আইনি ও সামাজিক কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই নিহত নুরজাহান বেগমের সেই উচ্চপদস্থ যুগ্ম সচিব ছেলে, বুয়েট শিক্ষক ছেলে এবং মেয়েকে পল্লবী থানায় এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পেলেই এটি হত্যাকাণ্ড নাকি অবহেলাজনিত মৃত্যু, তা নিশ্চিত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জান্নাত সকালবেলা