‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর রিভিউ

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০২:৪৯ অপরাহ্ণ
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর রিভিউ
নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি বছরের পবিত্র ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সিনেমা মহলে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক দীর্ঘ, তাত্ত্বিক ও অত্যন্ত ব্যতিক্রমী রিভিউ লিখেছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। গত সোমবার (১ জুন) রাত ১১টার দিকে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার গল্প, বিভিন্ন চরিত্র এবং মানবজীবনের গভীর দর্শনকে এক অনন্য সুতোয় গেঁথে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, এই সিনেমাটি কেবল সাধারণ বিনোদন নয়, বরং মানুষের যাপিত জীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।

আজ মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল ১০টা ১০ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিনোদন’ ও ‘জাতীয় রাজনীতি’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে হাসনাত আবদুল্লাহর সেই আলোচিত রিভিউ এবং সিনেমার অন্তর্নিহিত দর্শন বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

সিনেমার একটি বিশেষ ও জনপ্রিয় দৃশ্যের সংলাপের প্রসঙ্গ টেনে তরুণ এই সংসদ সদস্য তাঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “সিনেমায় অসুস্থ এক মায়ের জন্য আকস্মিক হেলিকপ্টার আনার আবদার শুনে মন্ত্রী মহোদয় অবাক হয়ে বললেন, ‘একটা মামুলি বিষয়কে আপনি এত বড় কেন করছেন?’ জবাবে গণিতের প্রফেসর রশিদ উদ্দিন উত্তর দিলেন, ‘মন্ত্রী সাহেব, মামুলি বিষয়কে বড় করে তোলাই তো মানুষের কাজ!’” হাসনাত আবদুল্লাহ মনে করেন, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ মুভিতেও পরিচালক ঠিক একই কাজ করেছেন। তিনি আরও লেখেন, “এখানে ছোট ছোট সাধারণ গল্প দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে অনেকগুলো চেনা মানুষের জীবনকে এবং তাদের বুকের ভেতরের লুকিয়ে থাকা গভীর দুঃখকে। সিনেমাটা দেখার পর বনলতা এক্সপ্রেসকে আপনার আর সাধারণ কোনো ট্রেন মনে হবে না; মনে হবে জীবন্ত দুঃখের এক চলমান বাহন, যার একেকটা বগি মানুষের একেকটা আলাদা দুঃখ দিয়ে ঠাসা।”

সিনেমার অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ডাক্তার আশাবের প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, “ম্যাজিক দেখানো, মায়ের সঙ্গে সবসময় মজা করা হাসিখুশি ছেলেটাও জীবনের একটা নির্মম পর্যায়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে ডুকরে কেঁদে বলল ‘না পারলাম ভালো মানুষ হইতে, না পারলাম ভালো ডাক্তার হইতে…।’ এই একটি সংলাপের সাথে সাথেই আশাব যেন হয়ে গেল বর্তমান বাংলাদেশের সমস্ত পরিবারের বড় ছেলে; যাদের পেছনের অতীতে থাকে শৈশবের এক একটা ট্রমা, বর্তমানজুড়ে থাকে একরাশ আফসোস, আর হাতে থাকে সমাজকে দেখানোর মতো কিছু অনর্থক ম্যাজিকের কার্ড।” তিনি পাঠকদের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে বলেন, “দেখতে দেখতে আমাদেরও মনে হয়, আমরাও কি আসলে অনর্থক কিছু কার্ড আর মুখে কৃত্রিম বা ফেইক হাসি ঝুলিয়ে বেড়ানো একেকজন ডাক্তার আশাব নই?”

সিনেমার অন্যান্য চরিত্রের সমীকরণ টেনে তিনি আরও লেখেন, “নিঃসন্তান কিন্তু প্রচণ্ড ক্ষমতাবান মন্ত্রী আবুল খায়ের, নাকি মাত্র ২৪ বছর বয়সি একমাত্র আদরের ছেলের লাশ বা কফিন নিয়ে একই ট্রেনে যাত্রা করা প্রফেসর রশিদ উদ্দিনকার দুঃখ আসলে জীবনে বেশি? অন্যদিকে হাতে মাত্র এক বছরের আয়ু নিয়ে আজিজ যখন তাঁর স্ত্রী, ছেলে আর মেয়ের ওপর থেকে মায়ার বাঁধন কাটাতে ব্যস্ত, ঠিক সেই একই সময়ে জীবনে নতুন যাত্রা শুরু করতে আশার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে সদ্য এডমিশন ক্যান্ডিডেট রুবি।” হাসনাত লেখেন, “যেই ট্রেনে একজন তরুণ কফিনে চড়ে চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছে, ঠিক একই ট্রেনে একজন তরুণী জীবনের এক নতুন গন্তব্যের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। একটি বিদায়ের দিকে, অন্যটি আগমনের দিকে; শেষ আর শুরুকে একই রেখায় বেঁধে। সেই একই রেললাইনে বসে গণিতের প্রফেসর কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন— হোল ওয়ার্ল্ডে আমি ম্যাথে জায়ান্ট নাম্বার এইট, কিন্তু ম্যাথ আমার হাতে নাই, ম্যাথ আমার হাতে নাই...।” এই দৃশ্যের প্রেক্ষিতে এনসিপির এই শীর্ষ নেতা প্রশ্ন তোলেন, “ম্যাথ বা জীবনের হিসাব কি আসলে আমাদের কারও হাতেই থাকে? নাকি আমাদের সব ম্যাথের চূড়ান্ত সমাধান নিয়ে ওপরে একজন অন্তর্যামী বসে থাকেন আর আমাদের মাটিতে হিসাব মেলানোর বৃথা ছোটোছুটি দেখেন?”

জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সংক্ষিপ্ত জীবনকে এক আধ্যাত্মিক লাইনে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, “জানাজার নামাজের কোনো আজান হয় না। কারণ জন্মের সময়ই আমাদের কানে আজান দিয়ে দেওয়া হয়। জন্মের সময় আজান আর মৃত্যুর সময় তার জানাজার নামাজ; এর মাঝখানের সময়টুকুই হলো আমাদের প্রকৃত জীবন।” এছাড়াও বনলতা এক্সপ্রেসকে একটি চলমান পৃথিবীর সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, যে পৃথিবীর এক পাশে সন্তানের কফিন, আরেক পাশে নতুন এক নিষ্পাপ শিশুর জন্ম। যে পৃথিবীর এক পাশে ক্ষমতার অন্ধ দম্ভ, আরেক পাশে মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। এক পাশে ভালোবাসার মানুষ নীলাকে হারিয়ে ফেলার তীব্র কষ্ট, আরেক পাশে চিত্রার বাড়িয়ে দেওয়া নতুন আশার হাত। দিনশেষে বনলতা এক্সপ্রেস আমার গল্প, আমাদের গল্পই। বারবার হাঁটু গেড়ে পড়ে যাওয়ার পরও আবার উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলাই মানবজাতির নিয়তি।

তিনি নিয়তির এক অনন্য উদাহরণ দিয়ে লেখেন, “নিয়তি বলেই একটা থেঁতলে যাওয়া ব্যাঙও মাটির সঙ্গে অর্ধেক লেপ্টে থাকা দেহটা নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বাঁচার জন্য লাফায়, চলে, চলতে থাকে। তাকে থামানো যায় না। এই চলতেই থাকাই জীবনের আসল ধর্ম। থেমে গেলেও, কষ্ট পেলেও জীবন কষ্ট পেতে পেতে সূর্যের মতো স্পষ্ট হয়ে সুস্মিত শিশিরের মতো সবার মাঝে বারবার ছড়িয়ে পড়ে।” এই বনলতা এক্সপ্রেসকে কেউ কোনোদিন থামাতে পারবে না উল্লেখ করে হাসনাত লেখেন, “কারণ এই ট্রেন মানবজীবনেরই মতো, যেখানে স্থবিরতা নয়, কেবল রূপান্তরই চূড়ান্ত সত্য। সেই রূপান্তরের ভেতর দিয়েই মানুষ অশ্রুকে অভিজ্ঞতায়, সংগ্রামকে সাফল্যে, দুঃখকে মহাকাব্যে আর সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে। যে রূপান্তর শিশুকে প্রৌঢ়ে, বীজকে বৃক্ষে, স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে, সেই রূপান্তরকে বন্ধ করে দেওয়ার সাধ্য কার আছে?”

উল্লেখ্য, প্রেক্ষাগৃহে আলোড়ন তোলা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন দেশের খ্যাতিমান নির্মাতা তানিম নুর। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি মূলত অ্যাডভেঞ্চার, রোমান্টিক ও কমেডি ঘরানার একটি মেলোড্রামা চলচ্চিত্র। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ করা ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে, যার প্রতিবাদে খোদ রুমিন ফারহানার মতো নেত্রীরাও সড়কে নেমেছেন। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই জাতীয় নাগরিক কমিটির শীর্ষ নেতার এই গভীর জীবনমুখী রিভিউ নেটদুনিয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’কে নিয়ে আলোচনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন