নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের কওমি মাদ্রাসা পড়ুয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে সরকারি নিয়মে আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে ‘সহকারী মৌলভী (মুজাব্বিদ/কারি)’ ও ‘ইবতেদায়ি কারি’ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘দাওরায়ে হাদিস’ সনদকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বুধবার (৬ মে ২০২৬) বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ শিক্ষাবোর্ড ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, এই নতুন নিয়ম কার্যকর করে খুব শীঘ্রই সারাদেশে ১৩ হাজারের বেশি সহকারী মৌলভী ও কারি নিয়োগের বিশাল সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়ার সভাপতিত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের বিশেষ নির্দেশনায়, বোর্ডের কো-চেয়ারম্যান আল্লামা শেখ সাজিদুর রহমানের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি শীর্ষ আলেম প্রতিনিধি দল এই বৈঠকে সরাসরি অংশ নেন।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, দেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁত ও শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষাদানের জন্য ‘সহকারী মৌলভী (মুজাব্বিদ/কারি)’ এবং ‘ইবতেদায়ি কারি’ পদে মোট ১৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। ‘সহকারী মৌলভী (মুজাব্বিদ/কারি)’ পদে আবেদন করতে হলে কওমি শিক্ষার্থীদের আল-হাইআতুল উলয়ার অধীনে দেওয়া ‘দাওরায়ে হাদিস’ সনদের পাশাপাশি এর অধীনস্থ যেকোনো অনুমোদিত ৬টি আঞ্চলিক বোর্ডের ‘ইলমে কেরাত’ অথবা ‘তাহফীজুল কুরআন’-এর বিশেষ সনদ জমা দিতে হবে।
শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি সভায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে শীঘ্রই দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি জাতীয় ক্বিরাআত ও হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা-২০২৬’ আয়োজন করা হবে। ‘কুরআন পড়, জীবন গড়’ স্লোগানে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় স্কুল, আলিয়া এবং কওমি মাদ্রাসার ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারবে। জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিতব্য এই প্রতিযোগিতায় দেশের অভিজ্ঞ ও দেশবরেণ্য হাফেজ ও কারিরা বিচারক (জাজ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়াও, কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও বিদেশ যাত্রার সুবিধার্থে সরকারি সমন্বিত পোর্টাল ‘MyGov’ প্ল্যাটফর্মে Apostille (অ্যাপোস্টিল) পদ্ধতিতে দাওরায়ে হাদীস সনদ ঘরে বসেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে সত্যায়নের বিষয়ে সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কারিগরি সচিব এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কওমি নেতাদের আশ্বস্ত করেন।
সভায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ (Teacher's Training) কার্যক্রম আরও জোরদার করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। একই সাথে, বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মূলধারার গণমাধ্যমে মাদ্রাসাবিরোধী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। আলেমদের সাইবার জগতে আরও বেশি সক্রিয় ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান বোর্ড নেতারা।
এই ঐতিহাসিক বৈঠকে আল-হাইআতুল উলয়া ও বিভিন্ন বোর্ডের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন— বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গার চেয়ারম্যান মুফতি রুহুল আমীন, আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তা‘লীম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল বছীর, তানযীমুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়ার সহকারী মহাসচিব মাওলানা মুফতি এনামুল হক, জাতীয় দীনী শিক্ষাবোর্ডের মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ আলী এবং আল-হাইআতুল উলয়ার অফিস ব্যবস্থাপক মাওলানা মু. অছিউর রহমান প্রমুখ।