নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়ায় এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরা দণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ মামলাতেই আসামিরা সরাসরি খালাস পাচ্ছে।
শনিবার (২ মে) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলপ) কর্মসূচির আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ৩২টি জেলায় নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলার নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিচার বিভাগের দৈন্যদশা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। জাতীয় বাজেটের দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট হয়। পুরো বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ মাত্র ২২০০ কোটি টাকা, যেখানে বিটিভির বরাদ্দ ২৫০০ কোটি টাকা। এই সীমিত বাজেটে বিচারকদের বেতন, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক খরচ চালানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।” মন্ত্রী আরও জানান, সরকার বর্তমানে জট পাকানো ৪০ লাখ মামলা কমিয়ে ৪ লাখে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ১ হাজার ৩৭০ দিন বা প্রায় ৩.৭ বছর সময় লাগছে। প্রতিটি মামলার জন্য গড়ে ২২ বার তারিখ পড়ছে আদালতে। এছাড়া ১৩ শতাংশ মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ তার বক্তব্যে বলেন, “বাজেট বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়। জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরবে না। বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ, চিকিৎসক ও আইন মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, সামাজিক কলঙ্ক ও চাপের কারণে ৭০ শতাংশ নারী আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারেন না। যারা আসেন, তারাও দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রভাবশালী পক্ষের চাপের কারণে অনেক সময় মামলা চালিয়ে নিতে পারেন না, যার ফলে আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুমের উপস্থাপিত এই গবেষণায় জানানো হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে সভায় বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেন।