মাদকই আইনশৃঙ্খলা অবনতির মূল কারণ’:ত্রাণমন্ত্রী
আবু রায়হান, রংপুর ব্যুরো: রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার পেছনে মাদকাসক্তদের বেপরোয়া উৎপাতকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “মাদকই সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির মূল কারণ। মাদকের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও দ্রুততম সময়ে নির্ভুল চার্জশিট দিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
আজ রবিবার (৩০ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাসভবন পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
হত্যাকাণ্ডটিকে অত্যন্ত লোমহর্ষক, পৈশাচিক ও মর্মান্তিক হিসেবে আখ্যায়িত করে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, “এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। আজ ঘটনাস্থলে এসে পরিবারের পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে যা বুঝলাম—মাদকাসক্তরা হয়তো প্রায়ই বাসার সম্মানিত শিক্ষক/কর্তাকে নানাভাবে উত্যক্ত ও বিরক্ত করত। তিনি তাদের অন্যায়ে বাধা দিতে গিয়েছিলেন বলেই হয়তো এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে।”
মন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত মূল দুই আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজেদের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। ফলে তাদের অপরাধে সম্পৃক্ততার বিষয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
বর্তমান সরকারের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার দৃঢ় অঙ্গীকার তুলে ধরে তিনি বলেন, “সরকার যেকোনো হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ও আপসহীন অবস্থানে রয়েছে। ইতিপূর্বে রামিসা হত্যা মামলায় দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট প্রদান ও বিচারিক রায় ঘোষণার নজির রয়েছে। এছাড়া লালমনিরহাটে কিশোরী নন্দিনী হত্যার বিচারও মাত্র ১৫ দিনের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে সম্পন্ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছিল।” মাছুয়াপাড়ার ঘটনার ক্ষেত্রেও পুলিশ দ্রুতই তদন্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিজ্ঞ আদালতে চার্জশিট পেশ করবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
মাদকের করাল গ্রাস রোধ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “আমার স্পষ্ট অভিমত—মাদকই আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টের প্রধান বিষফোঁড়া। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রুখতে ইতিমধ্যে সংসদে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করা হয়েছে। যেহেতু এতে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি রয়েছে, তাই তৃণমূলের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, কেবল প্রশাসন বা পুলিশের একার পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। রংপুরবাসীর প্রতি পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দিয়ে তিনি বলেন, সামাজিকভাবে একতাবদ্ধ হতে পারলে মাদক ব্যবসায়ী, পাচারকারী এবং সেবনকারীদের মূলোৎপাটন করে আইনের আওতায় নেওয়া সম্ভব হবে।
মন্ত্রীর পরিদর্শনকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু, জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান, জেলা পরিষদ প্রশাসক সাইফুল ইসলামসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
উল্লেখ্য, রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে গৃহকর্তা গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের অপর দুই সদস্যসহ মোট চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গোটা অঞ্চলে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। টানা কয়েক দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের কোনো খোঁজ না পেয়ে প্রতিবেশীদের সন্দেহের প্রেক্ষিতে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে ভেতর থেকে পচাগলা মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করলে তারা হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি প্রদান করে। হত্যাকাণ্ডে আরও কারও মদদ বা প্রত্যক্ষ যোগসূত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের নিবিড় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।