বাংলাদেশে ধানের ভবিষ্যৎ ও ২০৪৬-এর খাদ্যনিরাপত্তার কৌশল

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে ধানের ভবিষ্যৎ ও ২০৪৬-এর খাদ্যনিরাপত্তার কৌশল

ড. মো. আনোয়ার হোসেন: বাংলাদেশের সঙ্গে ধানের সম্পর্ক কেবল কৃষি বা খাদ্যের সম্পর্ক নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। স্বাধীনতার পর সীমিত জমি ও দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার মধ্যেও বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। উন্নত জাত, সেচ, সার, কৃষি সম্প্রসারণ এবং কৃষকের প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে কয়েক দশকে ধান উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবন এ অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু ভবিষ্যতের বাস্তবতা অতীতের মতো নয়। ২০৪৬ সালের বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পুরোনো ধারণা যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা, জলবায়ু অভিযোজন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সমন্বিত কৌশল।

বর্তমানে দেশের ধান উৎপাদন প্রায় চার কোটি টনের কাছাকাছি। এই উৎপাদন দেশের খাদ্যনিরাপত্তার শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু জনসংখ্যা, নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের সঙ্গে খাদ্যের চাহিদার প্রকৃতিও বদলাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে এবং কৃষি থেকে শ্রমের স্থানান্তর অব্যাহত রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের ধান উৎপাদনের সাফল্য শুধু মোট উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। প্রতি হেক্টরে ফলনের পাশাপাশি কত কম পানি, শ্রম, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে সেই উৎপাদন অর্জিত হচ্ছে এবং কৃষকের হাতে প্রকৃতপক্ষে কত আয় থাকছে—এসব সূচকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের জন্য কৃষিজমি সংরক্ষণ তাই খাদ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে মূল্যবান কৃষিজমি হারানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একই পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনের জন্য জমির ওপর চাপ আরও বাড়বে। তবে বাস্তবতা হলো, উন্নয়ন ও কৃষিজমি সংরক্ষণের মধ্যে সম্পূর্ণ বিরোধ তৈরি করে সমাধান পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন হবে পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার। উচ্চ উৎপাদনশীল কৃষিজমি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করে সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিকে লাভজনক করতে হবে, যাতে কৃষক জমি অন্য কাজে ব্যবহারের তুলনায় কৃষিকাজে অর্থনৈতিকভাবে বেশি সুবিধা দেখতে পান।

কৃষি শ্রমের পরিবর্তনও ভবিষ্যতের একটি স্থায়ী বাস্তবতা। গ্রামের তরুণদের একটি বড় অংশ কৃষির বাইরে শিল্প, সেবা, ব্যবসা ও বিদেশে কর্মসংস্থানের দিকে যাচ্ছে। এটিকে শুধু কৃষির জন্য সংকট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; এটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের স্বাভাবিক অংশ। তাই তরুণদের কায়িক শ্রমে কৃষিতে ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে কৃষিকে এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে কম শ্রমে বেশি উৎপাদন এবং বেশি আয় সম্ভব। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকবে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত কৃষিজমির বাস্তবতায় প্রত্যেক কৃষকের নিজস্ব কৃষিযন্ত্র কেনা সম্ভব নয়। তাই ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে কৃষিযন্ত্র সেবা-ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা অধিক কার্যকর হতে পারে। স্থানীয় উদ্যোক্তা, কৃষক সমবায় বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার, মেকানিক্যাল উইডার ও ড্রায়ার কিনে কৃষকদের সেবা দিতে পারে। এতে কৃষকের মূলধনী ব্যয় কমবে, সময়মতো ফসল সংগ্রহ করা সহজ হবে এবং গ্রামীণ তরুণদের জন্য নতুন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ভবিষ্যতের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ তাই শুধু শ্রম সংকট মোকাবিলার উপায় নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরিরও সুযোগ।

ধান উৎপাদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো পানি। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর উৎপাদন দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বড় অবদান রাখলেও কিছু অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এ কারণে বোরো ধানকে সরাসরি কমিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো অধিক বাস্তবসম্মত পথ। Alternate Wetting and Drying বা AWD, সেচের সময় বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ, ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার, খাল-বিল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে একই জমিতে কম পানি ব্যবহার করে উৎপাদন ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে সেচনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে—একক পরিমাণ পানিতে কত কেজি ধান উৎপাদিত হচ্ছে।

মাটির স্বাস্থ্যও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতার অন্যতম ভিত্তি। দীর্ঘদিনের নিবিড় চাষাবাদ ও ভারসাম্যহীন সার ব্যবহারের কারণে অনেক অঞ্চলে মাটির জৈব পদার্থ ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে দেশের সব এলাকার মাটির সমস্যা এক নয়। তাই ভবিষ্যতে সার ব্যবস্থাপনা আরও বেশি জমি ও অঞ্চলভিত্তিক হতে হবে। মাটির নিয়মিত পরীক্ষা, Soil Health Card, ডিজিটাল soil mapping এবং Site-Specific Nutrient Management-এর মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জৈব সার, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশের সঠিক ব্যবহার এবং জৈব পদার্থ বৃদ্ধির উদ্যোগ এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

তবে আগামী দুই দশকে বাংলাদেশের ধান উৎপাদনের সবচেয়ে অনিশ্চিত উপাদান হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তন। হাওরে আগাম বন্যা, উপকূলে লবণাক্ততা ও জলোচ্ছ্বাস, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ধান উৎপাদনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ধানের প্রজনন পর্যায়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রা দানা গঠনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। একইভাবে আকস্মিক বন্যা বা লবণাক্ততা একটি সম্পূর্ণ মৌসুমের বিনিয়োগ নষ্ট করে দিতে পারে। তাই ভবিষ্যতের ধান গবেষণায় জলবায়ু সহনশীলতা আর একটি অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি জাত উদ্ভাবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এখানেই বাংলাদেশের ধান গবেষণায় একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সর্বজনীন ‘জলবায়ু-সহনশীল জাত’ উদ্ভাবন নয়, বরং অঞ্চলভিত্তিক ‘climate-resilient rice system’ গড়ে তোলা। হাওরের জন্য স্বল্পমেয়াদি জাত ও দ্রুত যান্ত্রিক harvesting, উপকূলের জন্য লবণাক্ততা সহনশীল জাত ও মিঠা পানির ব্যবস্থাপনা, বরেন্দ্রের জন্য পানি-সাশ্রয়ী জাত ও সেচ প্রযুক্তি এবং জলাবদ্ধ এলাকার জন্য জলমগ্নতা সহনশীল জাত—এভাবে গবেষণা ও প্রযুক্তিকে agro-ecological zone অনুযায়ী সাজাতে হবে।

জাত উদ্ভাবনেও একইভাবে বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের ধান হবে শুধু উচ্চফলনশীল নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি, তাপসহিষ্ণু, লবণাক্ততা বা জলমগ্নতা সহনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং উন্নত grain quality-সম্পন্ন হতে হবে। এক জাতের মধ্যে সব বৈশিষ্ট্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্জন করা কঠিন। তাই কোন অঞ্চলে কোন বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, সেই অনুযায়ী breeding priority নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এ কাজে genomics, marker-assisted breeding, genomic selection, high-throughput phenotyping এবং artificial intelligence গবেষণাকে দ্রুততর করতে পারে। Gene editing বা CRISPR/Cas প্রযুক্তিও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, biosafety, food safety এবং যথাযথ regulatory framework-এর ভিত্তিতে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অযথা বিলম্ব যেমন ক্ষতিকর, তেমনি যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া প্রযুক্তি মাঠে নিয়ে আসাও দায়িত্বশীল বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পরিবর্তন শুধু উৎপাদন ব্যবস্থায় নয়, চালের বাজারেও ঘটছে। আয় বৃদ্ধি, নগরায়ন ও স্বাস্থ্যসচেতনতার ফলে ভোক্তার চাহিদা এখন আগের তুলনায় বৈচিত্র্যময়। সরু ও সুগন্ধি চালের পাশাপাশি পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং বিশেষ খাদ্যগুণসম্পন্ন চালের চাহিদাও বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতের rice breeding-এ zinc ও iron সমৃদ্ধ জাত, উন্নত cooking quality, aromatic rice এবং কম glycemic response-সম্পন্ন চালের মতো বৈশিষ্ট্যের ওপর গবেষণা বাড়াতে হবে। তবে কোনো বিশেষ স্বাস্থ্যগুণকে বাজারজাত করার আগে তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও ভোক্তার প্রকৃত চাহিদা যাচাই করা জরুরি।

এখানে বাংলাদেশের খাদ্যনীতির একটি মৌলিক বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু চালের নিরাপত্তা নয়। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় চালের প্রধান ভূমিকা থাকলেও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য মাছ, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফল, ডিম ও অন্যান্য খাদ্যের প্রয়োজন। তাই সব অঞ্চলে একই ধরনের নিবিড় ধান চাষ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পরিবেশ ও অর্থনীতির উপযোগী এলাকায় ধানভিত্তিক ফসল বৈচিত্র্য বাড়ানো প্রয়োজন। এতে কৃষকের আয়, মাটির স্বাস্থ্য এবং জাতীয় পুষ্টি—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।

প্রযুক্তির আরেকটি বড় পরিবর্তন আসবে কৃষিতে তথ্যের ব্যবহারে। Satellite imagery, drone, IoT sensor, weather forecasting এবং artificial intelligence ভবিষ্যতের কৃষি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল কৃষির উদ্দেশ্য শুধু কৃষকের হাতে একটি অ্যাপ তুলে দেওয়া নয়; বরং সঠিক সময়ে সঠিক কৃষকের কাছে কার্যকর সিদ্ধান্ত পৌঁছে দেওয়া। কোনো অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়লে দ্রুত harvesting-এর পরামর্শ, খরাপ্রবণ এলাকায় সেচের প্রয়োজনীয়তা, রোগের প্রাথমিক লক্ষণ বা বাজারদরের পরিবর্তন—এসব তথ্য কৃষকের উৎপাদন সিদ্ধান্তকে আরও কার্যকর করতে পারে। ভবিষ্যতের কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থাকে তাই তথ্য সরবরাহকারী থেকে decision-support system-এ রূপান্তর করতে হবে।

কৃষকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও নতুন করে ভাবতে হবে। কৃষক একজন উদ্যোক্তা, কিন্তু তার উৎপাদন প্রাকৃতিক ঝুঁকির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। বন্যা, খরা বা ঘূর্ণিঝড়ে ফসল নষ্ট হলে শুধু উৎপাদন নয়, তার পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে। এ কারণে weather-indexed বা index-based crop insurance ধীরে ধীরে চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে সারাদেশে একসঙ্গে নয়; নির্দিষ্ট ফসল, নির্দিষ্ট অঞ্চল ও নির্দিষ্ট ঝুঁকি নিয়ে pilot প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু করা অধিক বাস্তবসম্মত। নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া ও satellite data ব্যবহার করে ক্ষতিপূরণ দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে কৃষকের আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়বে।

ধান উৎপাদনের পরে সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে উৎপাদিত ধান সঠিক সময়ে কাটা, শুকানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা না গেলে উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল কমে যায়। তাই গ্রামীণ পর্যায়ে আধুনিক drying facility, moisture meter, community storage এবং উন্নত milling infrastructure-এর প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও কৃষক সমবায়কে যুক্ত করা হলে একটি কার্যকর value chain গড়ে উঠতে পারে।

ধানের উপজাত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ধানের কুঁড়া থেকে rice bran oil, তুষ থেকে biomass energy, খড় থেকে feed ও অন্যান্য পণ্য এবং rice husk থেকে মূল্য সংযোজিত শিল্পপণ্য তৈরি করা সম্ভব। ভবিষ্যতের rice economy-তে ধানের প্রতিটি অংশকে অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এতে একই উৎপাদন থেকে আরও বেশি মূল্য সৃষ্টি হবে এবং কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ শক্তিশালী হবে।

এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য কৃষি গবেষণার কাঠামোকেও নতুনভাবে সাজাতে হবে। BRRI, BINA, BARI, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে গবেষণা ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের একটি কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন। গবেষণার সাফল্য শুধু নতুন জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সংখ্যায় পরিমাপ করা উচিত নয়। একটি জাত কৃষকের উৎপাদন খরচ কত কমিয়েছে, আয় কত বাড়িয়েছে, পানি ও শ্রমের প্রয়োজন কতটা কমিয়েছে এবং কত দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছেছে—এসবকে গবেষণার প্রকৃত প্রভাবের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এখানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৃষি গবেষণার একটি নতুন দর্শন প্রয়োজন—‘Lab to Land’-এর পাশাপাশি ‘Data to Decision to Land’। অর্থাৎ গবেষণার তথ্য মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হবে, মাঠ থেকে আবার নতুন তথ্য গবেষণাগারে ফিরে আসবে এবং সেই feedback-এর ভিত্তিতে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটবে। এই দ্বিমুখী গবেষণা-সম্প্রসারণ ব্যবস্থা ছাড়া ২০৪৬ সালের জটিল কৃষি বাস্তবতা মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক সুবিধা কৃষক কীভাবে পাবেন। নতুন জাত, নতুন যন্ত্র বা নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি তখনই টেকসই হবে, যখন কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, ঝুঁকি কমবে অথবা বাজারে তার পণ্যের মূল্য বাড়বে। তাই ভবিষ্যতের কৃষিনীতি শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দিকে না তাকিয়ে কৃষকের net return বা নিট আয়কে অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষক লাভবান না হলে কোনো প্রযুক্তি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

২০৪৬ সালের বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক Rice Security Strategy। এর মূল লক্ষ্য হবে কৃষিজমি সংরক্ষণ, পানি ব্যবহারে দক্ষতা, শ্রম সাশ্রয়ী যান্ত্রিকীকরণ, জলবায়ু সহনশীল জাত, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও বাজারমুখী চাল, ডিজিটাল কৃষি, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের লাভজনকতা—এসবকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা।

বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ অবশ্যই বড়। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জকে শুধু সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। সীমিত জমি আমাদের আরও দক্ষ হতে বাধ্য করবে, শ্রমের ঘাটতি যান্ত্রিকীকরণকে ত্বরান্বিত করবে, জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণাকে আরও উদ্ভাবনী করবে এবং ভোক্তার পরিবর্তিত চাহিদা আমাদের চালের মান ও পুষ্টিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করবে। অর্থাৎ সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সীমাবদ্ধতাই নতুন উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি হতে পারে।

২০৪৬ সালের বাংলাদেশের ধানের ভবিষ্যৎ তাই শুধু ‘আরও বেশি ধান উৎপাদন’-এর ভবিষ্যৎ নয়। এটি হবে কম জমিতে অধিক উৎপাদন, কম পানিতে অধিক ফলন, কম শ্রমে অধিক দক্ষতা, কম ঝুঁকিতে অধিক কৃষক আয় এবং অধিক পুষ্টি ও মানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনের ভবিষ্যৎ।

অতীতে বাংলাদেশের কৃষির সাফল্যের ভিত্তি ছিল উচ্চফলনশীল জাত, সেচ, সার ও প্রযুক্তির বিস্তার। আগামী দুই দশকের সাফল্যের ভিত্তি হতে হবে বিজ্ঞান, তথ্য, জলবায়ু অভিযোজন, যান্ত্রিকীকরণ, সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা এবং কৃষকের লাভজনকতার সমন্বয়। এই রূপান্তর এখন থেকেই শুরু করতে পারলে ২০৪৬ সালের বাংলাদেশ শুধু খাদ্যনিরাপত্তা ধরে রাখবে না; বরং সীমিত সম্পদের মধ্যে একটি দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর, জলবায়ু-সহনশীল ও কৃষকবান্ধব ধান অর্থনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে।

লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালক, এলএসটিডি প্রকল্প, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

নিক নেম: এআইএল/সকালবেলা


মন্তব্য করুন