কাউকে নোটিশ দিয়ে নামাজে বাধ্য করা যায় না : সংসদে জামায়াত এমপির প্রস্তাবে স্পিকার

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ পূর্বাহ্ণ
কাউকে নোটিশ দিয়ে নামাজে বাধ্য করা যায় না : সংসদে জামায়াত এমপির প্রস্তাবে স্পিকার
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম

দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সালাত (নামাজ) কায়েম এবং প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের ওপর তাগিদ দিয়ে তিনি অধিবেশন চলাকালে নামাজের নির্ধারিত বিরতিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর অনুরোধ জানান।

গতকাল বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) জাতীয় সংসদের কার্যবিধির আওতায় পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুজিবুর রহমান এই আহ্বান তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

বক্তব্যের শুরুতেই সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর আস্থার প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত এমপি বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধানে একটি মৌলিক ধারা ছিল—‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর মূল ভিত্তি’। কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সেই নীতিকে সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেয়।”

সংসদের কার্যক্রম চলাকালে আসর ও মাগরিবের নামাজের জন্য প্রদত্ত বিরতির উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মাননীয় স্পিকার, আপনি কিছুক্ষণ আগেই আসরের নামাজের জন্য আধঘণ্টা বিরতি দিয়েছেন। মাগরিবের নামাজের জন্যও হয়তো আরও আধঘণ্টা বিরতি দেওয়া হবে। এই বিরতির মূল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী যারা ঈমানদার তারা যেন সময়মতো নামাজ আদায় করতে পারেন।”

তিনি যুক্তি তুলে ধরেন, সমাজে সততা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে নামাজের কোনো বিকল্প নেই। মানুষ নামাজি ব্যক্তিদের সম্মান করে, তাদের সৎ মনে করে এবং তাদের ওপর আস্থা রাখে। পবিত্র কুরআনের বিধান উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মহান আল্লাহ তাআলা পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন—যাদের তিনি পৃথিবীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দান করবেন, তাদের প্রধানতম দায়িত্ব হবে সমাজে সালাত কায়েম করা এবং যাকাত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সালাত চালু হলে মানুষের নৈতিক চরিত্র ভালো হবে এবং যাকাত ব্যবস্থা সফলভাবে চালু করা গেলে দেশের ক্ষুধা, চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্ব চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে।”

সংসদে উপস্থিত সকল আইনপ্রণেতার পরকালীন জবাবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “১০০ বছর পর আমাদের কেউ এই সংসদে থাকবে না। স্পিকার মহোদয় আপনিও থাকবেন না, আমরা সদস্যরাও থাকব না। কবরে গিয়ে আমাদের কী পরিণতি হবে, সেদিন তা মর্মে মর্মে টের পাওয়া যাবে। তাই আমাদের সন্তানরা যাতে ৭ বছর বয়স থেকেই নামাজের প্রশিক্ষণ পায় এবং ১০ বছর হলে তাদের নিয়মিত নামাজি বানানোর যে তাগিদ হাদিসে এসেছে, তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে ভূমিকা নিতে হবে।” এ লক্ষ্যে স্পিকারকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শ করে কার্যকর রূপরেখা প্রণয়নের প্রস্তাব দেন তিনি।

জামায়াত এমপির এমন বক্তব্যের পর তাৎক্ষণিক রুলিং ও প্রতিক্রিয়া জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, ধর্ম পালন মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও স্বাধীনতার বিষয়।

স্পিকার বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় একটি বিষয়। সংবিধানে প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ইসলাম মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। যথাযথভাবে ধর্ম পালন করলে বেহেশত লাভ এবং ধর্ম পালনে অবহেলা করলে জাহান্নামের শাস্তির কথা প্রতিটি ধর্মেই উল্লেখ রয়েছে। সংসদ সদস্যরা সচেতন ও ধর্মপ্রাণ নাগরিক হিসেবে নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার বিধান অনুসরণ করবেন।”

তবে রাষ্ট্রের আইনসভা থেকে কাউকে ধর্ম পালনে বাধ্য করার সুযোগ নেই উল্লেখ করে স্পিকার দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, “সংসদীয় স্পিকারের কোনো দাপ্তরিক নোটিশ জারি করে কাউকে ধর্ম পালন বা নামাজ পড়তে বাধ্য করা যায় না।”

বক্তব্যের ইতি টেনে স্পিকার মুজিবুর রহমানের আন্তরিক অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বলেন, “তবুও আপনি যে ধর্মীয় অনুভূতি ও সদুপদেশ নিয়ে কথাগুলো বলেছেন, সংসদ আপনার সেই সেন্টিমেন্টকে সম্মান জানাচ্ছে। আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক জীবনে আল্লাহর নির্দেশাবলি সঠিকভাবে মান্য করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকব।”

মন্তব্য করুন