স্কুল-কলেজের অব্যয়িত হাজার কোটি টাকা কোষাগারে নিতে চায় সরকার

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২২ পূর্বাহ্ণ
স্কুল-কলেজের অব্যয়িত হাজার কোটি টাকা কোষাগারে নিতে চায় সরকার
শিক্ষা মন্ত্রণালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: বছরের পর বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত আদায় করা ছাত্র সংসদ ফি এবং তপশিলভুক্ত বিভিন্ন খাতের অব্যয়িত অন্তত হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিতে তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে দেশের সরকারি স্কুল-কলেজগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকা এই টাকা সরকারি কোষাগারে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে সরকারের এই পদক্ষেপে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা।

প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সুস্পষ্ট ভাষ্য, নানা প্রতিকূলতা ও জটিলতার কারণে কিছু খাতের টাকা প্রতিবছর খরচ করা সম্ভব হয় না। তবে সেই টাকা পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, খণ্ডকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনভাতা এবং প্রতিষ্ঠানের জরুরি সংস্কার কাজে ব্যবহার করা হয়। ছাত্রদের কাছ থেকে নেওয়া এই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে স্থানান্তর করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক আর্থিক অচলাবস্থায় পড়বে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি খাতে ফি নেওয়া হয়। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় এবং করোনা মহামারি ও ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে অনেক খাতের টাকা যথাসময়ে খরচ করা যায়নি। ফলে বিপুল অঙ্কের অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবে অব্যয়িত অবস্থায় জমে আছে।

সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমে বড় ২৮টি সরকারি কলেজ তাদের অব্যয়িত অর্থের হিসাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কলেজের বিস্তারিত হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কেবল এই ২০টি প্রতিষ্ঠানেই ছাত্র সংসদ কার্যকর না থাকা সত্ত্বেও আদায় করা ১০ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৭২ টাকা পড়ে আছে। এ ছাড়া অন্যান্য তপশিলভুক্ত খাতে অব্যয়িত রয়েছে আরও ৯২ কোটি ৫৯ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৫ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ২০টি কলেজেই অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ১০২ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি। সারা দেশের ৬৪২টি সরকারি কলেজ ও ৬৩টি সরকারি স্কুল-কলেজের সামগ্রিক হিসাব বিবেচনা করলে এই অর্থের অঙ্ক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭২ হাজার ৯৯২ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। ইডেন মহিলা কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৬১ হাজার ৫০৮ টাকা ও অন্যান্য খাতে ৯ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ৯৫০ টাকা ব্যাংকে জমা আছে।

এ ছাড়া আনন্দমোহন কলেজে অন্যান্য খাতে ৬ কোটি ৮ লাখ টাকা, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে ৫ কোটি ১ লাখ টাকা, কারমাইকেল কলেজে ৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা, সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজে ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজে বিভিন্ন খাতে প্রায় চার কোটি টাকা অব্যয়িত অবস্থায় ব্যাংকে অলস পড়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষরা জানান, ভর্তির ফি থেকে সরকার রাজস্ব পেলেও বাকি টাকা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তহবিলে সংরক্ষিত থাকে। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কে এম ইলিয়াস জানান, “বর্তমানে ছাত্র সংসদ ফি নেওয়া বন্ধ থাকলেও আগের জমানো অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ে নিতে চাইছে। পুরো বিষয়টি তারা তদারকি করছে।”

কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, “যে অর্থ নেওয়া হয় তা মূলত ছাত্রদের কল্যাণেই ব্যয় করা হয়। বিগত দিনে করোনা এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে কিছু টাকা খরচ করা যায়নি। এখন সব টাকা সরকার চেয়ে চিঠি দিয়েছে। আমরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছি।”

মাউশির বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, “সরকার ভাবছে এই অলস অর্থ কোষাগারে জমা করার কথা, আর প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা ভাবছেন না দেওয়ার কথা। কারণ স্কুল-কলেজে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকায় সরকারি জনবল কাঠামোর বাইরে বহু খণ্ডকালীন শিক্ষক ও কর্মচারী রাখতে হয়, যাদের বেতন এই ফান্ড থেকে দিতে হয়। হঠাৎ সরকার সব টাকা নিয়ে গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় সংকটে পড়বে। তাই অর্থ একবারে না নিয়ে একটি স্বচ্ছ নীতিমালা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।”

তবে সরকারের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান জানান, সরকারি আর্থিক বিধিবিধান অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়ম অমান্য করে অর্থ ব্যাংকে ফেলে রাখা হয়েছে। তাই মাউশির মাধ্যমে দ্রুত টাকা জমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এতে ব্যর্থ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মন্তব্য করুন