বিএডিসির সেচ প্রকল্পে অনিয়ম: প্রকৌশলী নুরুল ইসলামকে বদলির দাবি
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৯ অপরাহ্ণ
অনক আলী হোসেন শাহিদী: বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণকাজ, পাইপের গুণগত মান, ঠিকাদারি কাজ বণ্টন এবং অর্থ লেনদেন নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের পাশাপাশি এক ঠিকাদারের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে প্রকল্পের বিপুল অর্থ ব্যয় ও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের প্রধান দাবি, তদন্তের স্বার্থে প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামকে অবিলম্বে বিএডিসির চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে অন্যত্র বদলি করতে হবে। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি পেলেও তিনি একই অঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও সম্ভাব্য সাক্ষীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা দূর হচ্ছে না। তাই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে তাঁর কর্মস্থল পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকল্পের সব নথি, ঠিকাদারি কার্যক্রম ও নির্মাণকাজ স্বাধীনভাবে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া, ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীরের অভিযোগের ভিত্তিতে করা মামলাটি সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করার দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা, অর্থ লেনদেনের প্রকৃতি এবং মামলার প্রেক্ষাপট নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতেই এ সুপারিশের কথা বলা হচ্ছে—কোনো ব্যক্তিকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করার জন্য নয়।
৬০২ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যয় ও অগ্রগতি যাচাইয়ের দাবি
বিএডিসির চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। বরাদ্দ ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখনন, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, পাইপলাইন স্থাপন, জলাধার পুনঃখনন, সোলার পাম্প স্থাপন, পাম্প হাউস নির্মাণ এবং কৃষিজমিতে সেচসুবিধা সম্প্রসারণের কাজ বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিএডিসির সেচ বিভাগ, উপবিভাগ-১-এর স্মারক নম্বর ৫১৬-এর মাধ্যমে তাঁকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহেদকে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নুরুল ইসলামের দায়িত্ব পালনকালসহ প্রকল্পে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৪৪৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এই ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে, নির্মাণকাজের মান কেমন এবং অনুমোদিত নকশা ও কার্যাদেশ অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রকল্পের নথি ও সরেজমিনের বাস্তবতার মধ্যে মিল যাচাই করা জরুরি।
লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের ব্যবধান
২০২৪–২৫ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনসংক্রান্ত সরবরাহ করা তথ্যে বেশ কয়েকটি কাজের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম অগ্রগতির চিত্র রয়েছে। যেমন—
• খাল পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২৫ কিলোমিটার; অর্জন ৩১২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার।
• বৈদ্যুতিক মোটরচালিত লো লিফট পাম্পের (এলএলপি) আনুষঙ্গিক মালামালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩৫ সেট; অর্জন ৯৩ সেট।
• ভূগর্ভস্থ সেচ পাইপ ও ফিটিংসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫৬ সেট; অর্জন ৪২২ সেট।
• আর্টেসিয়ান নলকূপের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০০টি; অর্জন ২১০টি।
• রাবার কটন হোস পাইপের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৮৩০টি; অর্জন ১ হাজার ৪০০টি।
• ১ দশমিক ৫ কিউসেক ক্ষমতার সোলার পাম্পের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২০ সেট; অর্জন ৪০ সেট।
• অনাবাসিক ও ইউনিট অফিস ভবনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২টি; অর্জন ১টি।
• জলাধার ও পুকুর পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০টি; অর্জন ৩০টি।
• সোলারচালিত ডাগওয়েলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০টি; অর্জন ৩০টি।
• ফসল রক্ষা বাঁধের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ কিলোমিটার; অর্জন ১২ কিলোমিটার।
• বড়, মাঝারি ও ছোট সেচ অবকাঠামো, পাইপ কালভার্ট ও ওয়াটার পাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৮০টি; অর্জন ৩২৯টি।
• বৈদ্যুতিক এলএলপি স্কিমের ভূগর্ভস্থ ইউপিভিসি পাইপের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫৫টি; অর্জন ১৭৫টি।
• এলএলপি ও সোলার পাম্পের পাম্প হাউস নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭০টি; অর্জন ১০৫টি।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের তথ্যেও বিভিন্ন কাজের অগ্রগতির বিবরণ রয়েছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, এলএলপির আনুষঙ্গিক মালামাল, ভূগর্ভস্থ পাইপ নির্মাণ, আর্টেসিয়ান নলকূপের উপকরণ এবং রাবার কটন হোস পাইপের ক্ষেত্রে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দাবি করা হয়েছে। একই অর্থবছরে খাল পুনঃখননে ৫২৫ কিলোমিটারের বিপরীতে ৫১২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, জলাধার ও পুকুর পুনঃখননে ৫০টির বিপরীতে ৪০টি, সোলারচালিত ডাগওয়েলে ৫০টির বিপরীতে ৩২টি এবং ফসল রক্ষা বাঁধে ৩০ কিলোমিটারের বিপরীতে ২৪ কিলোমিটার অর্জনের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আর্টেসিয়ান নলকূপে ৫০০টির বিপরীতে ৩৯৫টি, সেচ অবকাঠামো ও কালভার্ট নির্মাণে ৯৮০টির বিপরীতে ৫৬৪টি, বৈদ্যুতিক এলএলপি স্কিমের পাইপলাইন সম্প্রসারণে ৪৫৫টির বিপরীতে ৪১২টি এবং পাম্প হাউস নির্মাণে ২৭০টির বিপরীতে ১৮৫টির অগ্রগতির কথা জানানো হয়েছে।
তবে লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের ব্যবধান নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা, অর্থবছরভিত্তিক প্রতিবেদন, বাস্তব কাজের পরিমাণ এবং ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পাইপের গুণগত মান নিয়ে অভিযোগ
প্রকল্পের কয়েকটি এলাকায় সেচ পাইপের গুণগত মান নিয়ে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিএম চর-পুচ্ছলিয়া পাড়া ৫ কিউসেক সেচ প্রকল্প, ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের হারুনুর রশিদ কৃষি সেচ প্রকল্প এবং রামু উপজেলার ডোছড়ি পূর্বপাড়া কৃষি সেচ প্রকল্প।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব এলাকায় পাইপ স্থাপনের সময় ‘এন মোহাম্মদ প্লাস্টিক’ নামের প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ২৮টি পাইপ ফেটে যায়। তাঁদের অভিযোগ, ঘটনার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রকল্পের শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানটি পাইপ সরবরাহ করে আসছে বলেও তাঁরা দাবি করেছেন।
এ অভিযোগ যাচাই করতে পাইপের ব্যাচ নম্বর, উৎপাদন ও পরীক্ষার সনদ, অনুমোদিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন, স্থাপনের পদ্ধতি এবং চাপ সহনক্ষমতা পরীক্ষা করা জরুরি। স্বাধীন প্রকৌশলগত পরীক্ষা ও সরেজমিন পরিদর্শনে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও সরবরাহকারীর দায় নির্ধারণ করতে হবে।
রেগুলেটর নির্মাণে নকশা ও উপকরণ নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের আওতায় রেগুলেটর নির্মাণকাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি কথিত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুপারিশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। তাঁদের দাবি, কিছু রেগুলেটর নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হয়নি, সিট পাইলের ড্রাইভের পরিমাণ কম রাখা হয়েছে, কংক্রিটের পুরুত্ব নকশায় নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম হয়েছে এবং কোথাও কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া, বাস্তবে যতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে, কোনো কোনো ঠিকাদারকে তার চেয়ে বেশি বিল দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের নাম জড়িয়ে তদন্ত দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
রেগুলেটরগুলোর অনুমোদিত নকশা, কাজের স্পেসিফিকেশন, সিট পাইলের ড্রাইভিং লগ, কংক্রিট পরীক্ষার ফল, পরিমাপ বই, তদারকি প্রতিবেদন এবং পরিশোধিত বিল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে স্বাধীন প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সরেজমিন পরীক্ষা করিয়ে নকশা থেকে বিচ্যুতি বা অতিরিক্ত বিলের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের সঙ্গে সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, ব্যবসায়িক স্বার্থ বা অন্য কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এমআরসি বিপ্লব, শেখ আহনাস এন্টারপ্রাইজ, ম্যাক্সওয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং, এ রহমান এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সিংহা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ফারুক এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সাদিক এন্টারপ্রাইজ।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ বণ্টন ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত মালিকানা, পরিচালনা, আর্থিক স্বার্থ এবং প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নিবন্ধন নথি, দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে। তাই বিষয়টি নথিভিত্তিক তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগে মামলা, সিআইডি তদন্তের সুপারিশ
প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকা অগ্রিম ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীর। তাঁর দাবি, কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে ওই অর্থ নেওয়া হলেও তাঁকে প্রতিশ্রুত কাজ দেওয়া হয়নি। পরে এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে নুরুল ইসলামের নির্দেশে বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন বলে আলমগীর অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানায় মামলাটি করা হয়। মামলার নম্বর ০৯, তারিখ ০৬.০১.২০২৬। তবে মামলার এজাহার, অভিযোগের প্রকৃতি, তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য মূল নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের গুরুত্ব, কথিত অর্থ লেনদেনের অঙ্ক এবং মামলার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অভিযোগকারীরা মামলাটির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মামলাটি অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) তদন্তের জন্য পাঠানোর সুপারিশ করার দাবি তোলা হয়েছে। তাঁদের মতে, সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের বিষয়টি বিবেচনা করা হলে অভিযোগে উল্লিখিত অর্থ লেনদেন, কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ, ঠিকাদারি নথি এবং মামলার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে মামলাটি সিআইডিতে পাঠানো হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন, তদন্তের বর্তমান পর্যায় এবং এখতিয়ারসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রতিবেদনের এ সুপারিশ কোনো পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করার দাবি নয়; বরং অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের প্রস্তাব।
অতীতের অভিযোগও নথিভিত্তিক যাচাইয়ের দাবি
অভিযোগকারীরা প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ের কিছু অভিযোগের কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের মধুপুর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সড়ক নির্মাণকাজ এবং ‘গুমাবি প্রকল্প’ ঘিরে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ২০১২ সালে পদোন্নতির পর ডাবল লিফটিং সেচ প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন, ২০১৪ সালে রাঙামাটিতে বদলি এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০১৫ সালের শেষ দিকে একটি কমিটির প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগ উঠে আসে এবং ২০১৬ সালে তাঁকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। পরে ২০১৭ সালে মুজিবনগর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২০–২১ সালে হবিগঞ্জে বদলি এবং সেখানে নতুন ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত হয়েছিল বলেও তাঁরা দাবি করেছেন।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের বদলির আদেশ, তদন্ত প্রতিবেদন, বিভাগীয় নথি, আদালতের রায় বা অন্য প্রামাণ্য দলিল যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ ওঠা, তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই নথি যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন হবে না।
বিশাল আকৃতির চেয়ার ঘিরে সরকারি বিধি নিয়ে প্রশ্ন
বিএডিসির চট্টগ্রাম অঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত নুরুল ইসলামের ব্যবহৃত বলে অভিযোগকারীরা একটি বড় আকৃতির চেয়ারের ছবি দিয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত আসবাবপত্র ব্যবহারের নীতিমালা ও প্রশাসনিক শিষ্টাচারের সঙ্গে এ ধরনের চেয়ারের ব্যবহার সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
তবে শুধু চেয়ারের আকার দেখে এর ব্যবহার বিধিবহির্ভূত বা অনৈতিক বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। চেয়ারটি সরকারি অর্থে কেনা হয়েছে কি না, ক্রয়মূল্য কত, কোন অনুমোদনে কেনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আসবাবপত্র ব্যবহারের বিধি কী—এসব যাচাই করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বদলির দাবি কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি পেলেও বর্তমানে বিএডিসির চট্টগ্রাম অঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের প্রধান উদ্বেগ, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অভিযোগের তদন্ত চলাকালে একই অঞ্চলে তাঁর কর্মরত থাকা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তাঁদের মতে, প্রকল্পের কাজ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সরবরাহকারী, তদারকি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সঙ্গে অঞ্চলের প্রশাসনিক যোগাযোগ থাকায় তদন্তের স্বার্থে তাঁকে অন্যত্র বদলি করা উচিত। এতে তদন্তকারী দল স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং সম্ভাব্য সাক্ষী ও নথিপত্রের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা থাকলে তা কমানো সম্ভব হবে।
নতুন প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ শাহেদ যেন স্বাধীনভাবে প্রকল্পের নথিপত্র যাচাই, নির্মাণকাজ পরিদর্শন এবং তদন্তে সহযোগিতা করতে পারেন, সে জন্যও প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এ কারণে অভিযোগকারীরা প্রকৌশলী নুরুল ইসলামকে অবিলম্বে বিএডিসির চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে অন্যত্র বদলির দাবি জানিয়েছেন।
তবে বদলির সিদ্ধান্ত কোনো অভিযোগকে আগাম সত্য ধরে নিয়ে নয়, বরং তদন্তের নিরপেক্ষতা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা, নথিপত্রের অখণ্ডতা এবং প্রশাসনিক স্বার্থ বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগে নাম আসা সব পক্ষকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও জরুরি।
অভিযোগ অস্বীকার প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের
এ বিষয়ে প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে কথা বলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলো সঠিক নয়। তাঁর এ অবস্থানও প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের নথিপত্র, ক্রয় ও দরপত্রের তথ্য, কাজের পরিমাপ, বিল-ভাউচার, পাইপের গুণগত মান এবং নির্মাণকাজের কারিগরি দিক স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রকৌশলী নুরুল ইসলামসহ অভিযোগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রামাণ্য নথি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা জরুরি
প্রকল্পের বিপুল বরাদ্দ, কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন, পাইপের মান, রেগুলেটর নির্মাণে নকশা অনুসরণের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এবং ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগে দায়ের করা মামলা—সবকিছুই নথিভিত্তিক ও নিরপেক্ষ যাচাই দাবি করে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগকারীদের সুপারিশ হলো—
১. প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামকে অবিলম্বে বিএডিসির চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে অন্যত্র বদলি করার বিষয়টি বিবেচনা করা, যাতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে।
২. প্রকল্পের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দরপত্র, কার্যাদেশ, ঠিকাদার নির্বাচন, উপকরণের মান, কাজের পরিমাপ, বিল পরিশোধ এবং ব্যয়ের হিসাব স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা।
৩. রেগুলেটর নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ, সিট পাইলের ড্রাইভের পরিমাণ, কংক্রিটের পুরুত্ব এবং নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান স্বাধীন প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা।
৪. অভিযোগে উল্লিখিত পাইপের গুণগত মান, ফেটে যাওয়ার ঘটনা এবং সরবরাহকারীর দায় নির্ধারণে সরেজমিন পরিদর্শন ও কারিগরি পরীক্ষা করা।
৫. ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা, সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, দরপত্র, কার্যাদেশ ও বিল পরিশোধের নথি যাচাই করা।
৬. ঠিকাদার মোহাম্মদ আলমগীরের অভিযোগের ভিত্তিতে করা মামলার এজাহার, তদন্তের অগ্রগতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ যাচাই করে মামলাটি সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের জন্য পাঠানোর সুপারিশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়া।
৭. অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি করা।
সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, কৃষকের সেচসুবিধা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের কর্মস্থল পরিবর্তনের দাবি এবং মামলাটি সিআইডিতে তদন্তের সুপারিশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের চূড়ান্ত ভিত্তি হতে হবে প্রামাণ্য নথি, স্বাধীন কারিগরি যাচাই এবং আইনসম্মত তদন্ত—ব্যক্তিগত অভিযোগ বা পূর্বধারণা নয়।