ভিডিও
স্টোরি
ফটো স্টোরি
শুভ সমদ্দার, স্টাফ রিপোর্টার (পিরোজপুর): ভোরের প্রথম আলো যখন বেলুয়া নদীর শান্ত জলে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই নীরবতা ভেঙে জেগে ওঠে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা এলাকা। মাঝির বৈঠার শব্দ, ট্রলারের ইঞ্জিনের গর্জন আর ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে নদীর বুক রূপ নেয় এক প্রাণচঞ্চল বাজারে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই নদীভিত্তিক ভাসমান হাট সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে টিকে আছে।
পিরোজপুর সদর থেকে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার এবং নাজিরপুর উপজেলা থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে বিলাঞ্চলীয় এই জনপদের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম নৌপথ। ফলে গত ৭০ বছর ধরে নদীকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই বিশাল বাজার। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বেচাকেনা। শীতকালে বেলা ১০টা এবং বর্ষায় সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলে এই ভাসমান লেনদেন।
শাকসবজি, চাল-ডাল, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে গাছের চারা, শ্যাওলা, হাঁস-মুরগি— এমনকি নৌকায় ভাসমান নাশতার দোকানও মেলে এই হাটে। পিরোজপুর ছাড়াও বরিশাল, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট ও শরীয়তপুর থেকে পাইকাররা এখানে আসেন। গোপালগঞ্জের আজিজুল হকের মতো অনেক পাইকার বংশপরম্পরায় এই হাটে ব্যবসা করছেন। তাঁদের মতে, নদীপথে পণ্য পরিবহনে খরচ কম হওয়ায় তাঁরা এই হাটকে অগ্রাধিকার দেন।
ষাটোর্ধ্ব কৃষক আব্দুল মজিদ জানান, এই হাটকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। কৃষকরা সরাসরি পণ্য বিক্রি করতে পারেন বলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কম এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি হাটবারে এখানে কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়।
উজ্জ্বল সম্ভাবনা সত্ত্বেও কিছু সমস্যায় ভুগছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। পদ্মা সেতু চালুর পর যাত্রীসংকটে এখান থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়েছে। ব্যবসায়ী শাহ আলম মুন্সীর মতে, পণ্য ঢাকায় পাঠাতে এখন অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। এছাড়া অগ্নিকাণ্ড বা নৌ-দুর্ঘটনা মোকাবিলায় একটি ‘নৌ ফায়ার স্টেশন’ স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী আব্দুর রবসহ স্থানীয়রা।
নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজিয়া শাজনাজ তমা জানান, বৈঠাকাটা ভাসমান হাট এই অঞ্চলের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
নৌকাভিত্তিক এই হাট কেবল একটি বাজার নয়, বরং নদীমাতৃক বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বেলুয়া নদীর বুকে প্রতিদিন শুধু নৌকাই ভাসে না, ভাসে হাজারো মানুষের স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার লড়াই।
এম.এম/সকালবেলা
| আজকের তারিখঃ বঙ্গাব্দ