নির্বাচন কমিশনের ২২৩১ কর্মীর চাকরি অনিশ্চিত
অনক আলী হোসেন শাহিদী: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ২ হাজার ২৩১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর বা আত্তীকরণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের সুপারিশ, সাত সদস্যের কমিটির সুপারিশ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির মতামত গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পক্ষ থেকে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা ২ হাজার ২৩১ জন কর্মীর ভবিষ্যৎ কী?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবলকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় নতুন করে নিয়োগের উদ্যোগ তাঁদের চাকরির ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। তারা জানতে চান, একই ধরনের কাজের জন্য যখন বিদ্যমান জনবলই দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছে, তখন নতুন করে জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিল।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রকল্পে কর্মরত ২ হাজার ২৩১ জন জনবলকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তি বা আত্তীকরণে নির্বাচন কমিশন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন নিয়োগের বিষয়টি একদিকে চললেও বিদ্যমান ২ হাজার ২৩১ জনের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি অন্যদিকে কেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে না?
গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ২২৩১ জন
আইডিইএ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত ২ হাজার ২৩১ জন জনবল দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসনাত মোহাম্মদ সায়েম ২১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কাছে পাঠানো পত্রে তাঁদের দায়িত্ব ও কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তাঁর দপ্তরের স্মারক নম্বর আইডিইএ-২/প্রশাসন/বিবিধ/০৩(অংশ-২)/২০২৩/২৫৪৩-এর ওই পত্রে বলা হয়, প্রকল্পে কর্মরত ২ হাজার ২৩১ জন জনবল ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ডাটাবেজ ও সার্ভার সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, কল সেন্টার পরিচালনা, স্মার্ট কার্ড পার্সোনালাইজেশন ও বিতরণ, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ১৮৩টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় তথ্যভাণ্ডার থেকে ডাটা শেয়ারিং, মাঠ পর্যায়ে প্রদত্ত সার্ভার ও সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ ও আপডেট, NOC ও SOC এবং VPN ব্যবস্থাপনা, অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার তৈরি, ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেম এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রমে প্রশিক্ষণসহ ভোটকেন্দ্রের কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছেন।
এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন মিশন ও দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি ও প্রদানের কাজেও তারা যুক্ত রয়েছেন।
অর্থাৎ, এই জনবল শুধু সাধারণ প্রশাসনিক কাজে নয়, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার তালিকা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজস্ব খাতে নেওয়ার সুপারিশ
ওই পত্রে প্রকল্প পরিচালক উল্লেখ করেন, ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০১৮’-এ KPI-ভুক্ত প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের বিষয়টি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় KPI-ভুক্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে রাজস্ব জনবলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি আইডিইএ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সুপারিশ করেন।
একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র আইন-২০২৩-এর প্রেক্ষাপটে জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও দায়িত্বের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা ওই সুপারিশে তুলে ধরা হয়।
সাত সদস্যের কমিটির প্রতিবেদন
২ হাজার ২৩১ জন জনবলকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একটি সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ওই কমিটির প্রধান।
কমিটি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরে প্রকল্প পরিচালক তাঁর দপ্তরের স্মারক নম্বর আইডিইএ-২/প্রশাসন/বিবিধ/০০৩/২০২১/২৯৫৫, তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর মাধ্যমে প্রতিবেদনটি সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কাছে পাঠান।
ওই প্রতিবেদনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়: ১. নির্বাচন কমিশন সচিবালয় KPI-ভুক্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এবং আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০১৮-এর প্রাসঙ্গিক বিধানের আলোকে জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহিতা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য প্রকল্পের আউটসোর্সিং জনবলকে প্রকল্পের জনবল কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে PSC কমিটির মতামত নিয়ে ডিপিপি সংশোধনের সুপারিশ করা হয়। এরপর উন্নয়ন প্রকল্প সমাপ্তির পর অত্যাবশ্যকীয় পদ রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরসংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী প্রকল্পের জনবলকে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর বা আত্তীকরণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। ২. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন দপ্তর গঠন করে প্রকল্পের বিদ্যমান জনবলকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর বা আত্তীকরণের প্রস্তাব করা হয়। ৩. নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যেসব পদ শূন্য রয়েছে, সেসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইডিইএ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের জনবলের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
কমিটির observaciones-এ বলা হয়, প্রকল্পের দক্ষ, অভিজ্ঞ ও শিক্ষিত আউটসোর্সিং জনবলকে প্রকল্পের জনবল কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তীতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর বা আত্তীকরণ করা হলে জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহিতা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি কার্যক্রমের গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব
কমিটির সুপারিশ এবং প্রকল্প পরিচালকের পত্রের পর বিষয়টি আরও এক ধাপ এগোয়। আইডিইএ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের স্মারক নম্বর আইডিইএ-২/প্রশাসন/বিবিধ/০৩(অংশ-২)/২০২৩/১০৩২, তারিখ ৭ এপ্রিল ২০২৫-এর পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রকল্প ও উন্নয়ন শাখা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠায়।
প্রকল্প ও উন্নয়ন শাখার পত্র নম্বর ১৭.০০.০০০০.০২১.১৪.০০৮.২৪(অংশ-২)-৮৬, তারিখ ২১ এপ্রিল ২০২৫-এর মাধ্যমে সচিব, অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো ওই পত্রে বলা হয়, আইডিইএ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে কর্মরত জনবলকে প্রকল্পের আওতায় সরাসরি জনবল কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনবল নির্ধারণসংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ গ্রহণ প্রয়োজন।
প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে কর্মরত জনবলকে প্রকল্পের আওতাধীন জনবল কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে প্রেরিত প্রস্তাবের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প জনবল নির্ধারণসংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও ওই পত্রে অনুরোধ করা হয়।
এতে স্পষ্ট যে ২ হাজার ২৩১ জন কর্মীকে প্রকল্পের জনবল কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর বা আত্তীকরণের বিষয়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তাহলে নতুন নিয়োগ কেন?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নতুন করে নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে ওই নিয়োগের পরীক্ষা শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন আইডিইএ প্রকল্পে দীর্ঘদিন কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসা ২ হাজার ২৩১ জন কর্মীর বিষয়ে নির্বাচন কমিশন নিজেই কমিটি গঠন করেছে, কমিটি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনবল নির্ধারণসংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ চেয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে। তাহলে সেই প্রক্রিয়া নিষ্পত্তির আগেই নতুন করে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগের প্রয়োজন হলো কেন?
তাদের আরও প্রশ্ন, নতুন নিয়োগের মাধ্যমে যদি একই ধরনের দায়িত্বের জন্য নতুন জনবল নেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত অভিজ্ঞ জনবলের অবস্থান কী হবে?
নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ
নতুন নিয়োগ পরীক্ষা নিয়েও বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করেই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ফলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে—উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন নিয়োগের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ২ হাজার ২৩১ জনকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কমিশনার মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, "নির্বাচন কমিশন সচিবালয় উচ্চ আদালতের নির্দেশে উক্ত নিয়োগ কার্যক্রম করছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কর্মরত ২ হাজার ২৩১ জন জনবলকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তি বা আত্তীকরণে নির্বাচন কমিশন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।"
তবে নির্বাচন কমিশনের এই বক্তব্যে ভুক্তভোগীরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু বাস্তবে তাদের চাকরির স্থায়ী নিশ্চয়তার বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত দেখা যাচ্ছে না।
২০০৭ সাল থেকে কর্মরত, এখন বয়সও পেরিয়ে গেছে
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যতম বড় উদ্বেগ তাঁদের বয়স। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পে কাজ করার কারণে অনেকেরই এখন সরকারি চাকরিতে নতুন করে আবেদন করার বয়সসীমা নেই।
তাদের বক্তব্য, তারা যখন ২০০৭ সাল থেকে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত হন, তখন তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন—এমন পরিস্থিতি তারা কল্পনাও করেননি।
দীর্ঘ সময় ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার তালিকা, ডাটাবেজ, সার্ভার, স্মার্ট কার্ড, কল সেন্টারসহ বিভিন্ন কারিগরি কার্যক্রমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাদের দাবি, এই অভিজ্ঞতা রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই নতুন করে চাকরির প্রতিযোগিতায় নামার পরিবর্তে দীর্ঘদিনের কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সততার মূল্যায়ন করে তাদের চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় কর্মীরা
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছুতেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি, ইতোমধ্যে কয়েকজন কর্মী দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে এসব ব্যক্তিগত ঘটনার কারণ সরাসরি চাকরির অনিশ্চয়তা—এমন দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি
চাকরির নিশ্চয়তা এবং রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছেও স্মারকলিপি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে এখনো তারা কোনো কার্যকর সমাধান পাননি বলে অভিযোগ তাদের।
তারা এখন দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চান। তাদের বক্তব্য, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা দাবি করছেন না; বরং দীর্ঘদিনের কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সততার যথাযথ মূল্যায়ন চান।
সামনে তিনটি পথ
সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ এবং প্রকল্প পরিচালকের পত্র বিশ্লেষণ করলে ২ হাজার ২৩১ জন কর্মীর বিষয়ে মূলত তিনটি পথের কথা উঠে আসে— ১. তাদের প্রকল্পের জনবল কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা; ২. জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন দপ্তরের মাধ্যমে রাজস্ব খাতে আত্তীকরণ করা; অথবা ৩. নির্বাচন কমিশনের বিদ্যমান শূন্য পদে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় অগ্রাধিকার দেওয়া।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
জবাবদিহিতার প্রশ্ন
জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনার মতো স্পর্শকাতর কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালনকারী একটি বিশাল জনবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একদিকে তাদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কমিটির সুপারিশ রয়েছে। অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জনবল কাঠামোতে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আবার একই সময়ে নতুন করে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
ফলে প্রশ্নগুলো এখন আরও স্পষ্ট— রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় নতুন নিয়োগের প্রয়োজন কেন হলো? দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ২ হাজার ২৩১ জনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন কীভাবে হবে? নতুন নিয়োগের ফলে তাদের অবস্থান কী হবে? অর্থ মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার যৌক্তিকতা কী? আর দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী এই ২ হাজার ২৩১ জনের চাকরির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলে এর দায়ভার নেবে কে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখন শুধু ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই চান না; জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ জনবল কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়েও সচেতন মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, প্রচলিত আইন ও বিধি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কমিটির সুপারিশ—সবকিছু সমন্বয় করে দ্রুত একটি স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালনকারী ২ হাজার ২৩১ জন কর্মীর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের চাকরির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা হবে।
এআইএল/সকালবেলা
|