রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে তাঁর কার্যালয়ে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে গত দেড় বছরের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ অংশে তিনি ৫ আগস্টের ঘটনাবলি, সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলা এবং তাঁর ওপর আসা মানসিক চাপের বর্ণনা দেন।
৫ আগস্টের সেই মুহূর্ত
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিনের স্মৃতি চারণ করে রাষ্ট্রপতি জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলন জনবিস্ফোরণে রূপ নিলে দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে জানানো হয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসছেন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই জানা যায় তিনি দেশত্যাগ করেছেন। বিকেল ৩টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান টেলিফোনে তাঁকে পরিস্থিতি অবহিত করেন। পরবর্তীতে তিন বাহিনী প্রধান বঙ্গভবনে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন।
জরুরি অবস্থা ও সামরিক শাসনের চাপ
রাষ্ট্রপতি জানান, ওই সময় দেশে জরুরি অবস্থা জারির জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাঁর ওপর চরম চাপ ছিল। তিনি বলেন, “আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল যেন আমি ইমার্জেন্সি দিই। এমনকি একটি প্রতিবিপ্লব ঘটানোর উদ্যোগও ছিল।” তবে সেনাপ্রধানসহ সশস্ত্র বাহিনী প্রধানরা সামরিক শাসন বা জরুরি অবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর দৃঢ় মনোবল এবং সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতায় সেই পরিস্থিতি সামাল দেন।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও সাংবিধানিক রক্ষাকবচ
সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকারের বিধান না থাকায় উদ্ভূত সাংবিধানিক সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চান। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালত মতামত দেয় যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা বৈধ। রাষ্ট্রপতি বলেন, “আদালতের সেই মতামতই আমার জন্য রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে।” ছাত্রদের অনড় অবস্থানের কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দেড় বছরের বন্দিদশা ও ব্যক্তিগত লাঞ্ছনা
রাষ্ট্রপতি আক্ষেপ করে বলেন, গত দেড় বছর তাঁকে অনেকটা প্রাসাদবন্দি করে রাখা হয়েছিল। সিঙ্গাপুর ও লন্ডনে চিকিৎসার জন্য ফলোআপ অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে বিদেশ যেতে নিষেধ করে। এমনকি জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তেও তাঁকে বাধা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “মূল উদ্দেশ্য ছিল আমি যেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি এবং পদত্যাগ করি।”
তারেক রহমান ও নতুন সরকার নিয়ে প্রত্যাশা
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে ইতিবাচক মূল্যায়ন করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “উনার মধ্যে রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলি আছে। আমি বিশ্বাস করি না যে আমরা কোনো নতুন দুর্যোগে পড়ব।” বর্তমানে তিনি নিজেকে চাপমুক্ত ও ভারমুক্ত মনে করছেন।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নিজের মেয়াদ নিয়ে রাষ্ট্রপতি পরিষ্কার করেন যে, ২০২৮ সাল পর্যন্ত তাঁর সাংবিধানিক মেয়াদ রয়েছে। তবে নির্বাচিত সরকার যদি চায় তিনি সরে যান, তবে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে প্রস্তুত। অবসরের পর একজন আইনি পরামর্শক হিসেবে বাকি জীবন কাটানোর ইচ্ছা পোষণ করেছেন তিনি।
কালেরকণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে অনুলিখন
আই.এ/সকালবেলা