বিশেষ বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য নিয়ে সরব হয়েছেন অধিকারকর্মীরা। বিবিসি নিউজ বাংলার এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জাইমা রহমানের ওপর এই আক্রমণ মূলত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নারীকে ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ (Easy Target) হিসেবে ব্যবহার করার এক দীর্ঘস্থায়ী ও নোংরা অভ্যাসের অংশ।
কেন জাইমা রহমানকে টার্গেট করা হচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যখন কোনো নারী জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন বা শক্তিশালী সামাজিক অবস্থান তৈরি করেন, তখন একশ্রেণির মানুষ তাকে হেয় করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। জাইমা রহমানের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক বা জীবনযাপনকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে তাঁর বাবার (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) রাজনৈতিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস মনে করেন, প্রতিপক্ষকে সরাসরি আক্রমণ করতে না পেরে তাঁদের পরিবারের নারীদের চরিত্রহনন করা একটি কার্যকর কিন্তু অত্যন্ত নিচুমানের কৌশল। জাইমার আগে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়ে মনিকা ইউনূস এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাতনীকেও একইভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে।
ডিজিটাল হেনস্তা ও প্রাইভেসি লঙ্ঘন
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো এআই (AI) দিয়ে তৈরি বা ব্যক্তিগত আড্ডার কি না—তা যাচাই না করেই অশালীন মন্তব্যের বন্যা বয়ে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ফেলো মাহিন সুলতানি বলেন, "একজন নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি তাঁর মৌলিক অধিকার। তিনি কার সাথে মিশবেন বা কী করবেন, তা অন্যের বিচার্য বিষয় হতে পারে না।" অথচ বাংলাদেশে পাবলিক ফিগারদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবন ও কাজের ক্ষেত্রের সীমানা মুছে ফেলে নোংরামি করাটা এক প্রকার ‘স্বাভাবিক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলনে নারী, ক্ষমতায় অনীহা
প্রতিবেদনে একটি বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে—জুলাই আন্দোলনের সময় নারীরা সম্মুখ সারিতে থাকলেও, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এখনো তারা পিছিয়ে। গত জাতীয় নির্বাচনে বড় দলগুলোর নারী মনোনয়নের হার ছিল অত্যন্ত নগণ্য। একদিকে সমাজ নারীকে ভোগ্যবস্তু বা দুর্বল হিসেবে দেখতে চায়, অন্যদিকে প্রতিবাদী বা স্বাধীনচেতা নারীকে ‘হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করে আক্রমণ চালায়।
সমাধানের পথ কী?
ডিজিটাল মাধ্যম বিশেষজ্ঞরা আইন প্রয়োগের চেয়ে সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আইনের অপপ্রয়োগের ভয় থাকায় গণসচেতনতাই প্রধান হাতিয়ার। অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসের মতে, ‘সিলেক্টিভ প্রতিবাদ’ বন্ধ করতে হবে। আক্রান্ত নারী নিজের দলের কি না বা পছন্দের কি না—তা না দেখে, লিঙ্গীয় বৈষম্য ও হেনস্তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তোলাই এই নোংরা সংস্কৃতি বন্ধের একমাত্র পথ।
এম.এম/সকালবেলা