পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের শহীদ হাদির বীরত্বগাথা

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০৪:০৪ অপরাহ্ণ
পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের শহীদ হাদির বীরত্বগাথা

নিজস্ব ডেস্ক:জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির বীর যোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির জীবন, কর্ম এবং দেশের জন্য তাঁর আত্মত্যাগের বীরত্বগাথা এবার জাতীয় পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে যে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হতে যাচ্ছে, সেখানে তরুণ এই বিপ্লবীর শাহাদাত ও পরবর্তী ঘটনাগুলো পাঠ্য হিসেবে যুক্ত করা হবে।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিমার্জন, এনসিটিবি পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষানীতি খতিয়ান’ এবং ‘জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ ও একাডেমিয়া উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে পাঠ্যবইয়ের এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

গত বুধবার (১০ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ কমিটির অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সদস্যগণ সভায় উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকেই শহীদ ওসমান হাদির বীরত্বগাথা পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়।

সভা সূত্র ও এনসিটিবি (NCTB) কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের বর্তমান ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ অধ্যায়ে যেভাবে ঐতিহাসিক বীর শহীদ তিতুমীর, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, নূর হোসেন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বীর শহীদ আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধকে উপস্থাপন করা হয়েছে; ঠিক একই বিন্যাসে ও সমান মর্যাদায় শরিফ ওসমান হাদিকে নিয়ে নতুন পাঠ তৈরি করা হবে।

কমিটির দায়িত্বশীল সদস্যরা জানিয়েছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু বড় ধরনের কাঠামোগত ও আদর্শিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মাধ্যমিক পর্যায়ের নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা বিখ্যাত দুটি প্রবন্ধ—‘একটি জাতির জন্ম’ এবং ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই প্রবন্ধ দুটির মূল ভাবনার আলোকে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করা হবে।

উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের আলোকে জরুরি ভিত্তিতে বই পরিমার্জন করেছিল। পরবর্তীতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর, আগামী ২০২৮ সাল থেকে একটি স্থায়ী ও আধুনিক নতুন শিক্ষাক্রম পুরোপুরি চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ওসমান হাদি, যাঁর বাবা পেশায় একজন মাদ্রাসা শিক্ষক। ওসমান হাদি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার আগে ঐতিহ্যবাহী নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে পড়ালেখা শেষ করেন। ঢাবি থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানে শুরু থেকেই রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন হাদি। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ গঠনে প্রধান ভূমিকা নেন এবং এর মুখপাত্র হিসেবে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল।

তবে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে অত্যন্ত নৃশংসভাবে দুর্বৃত্তরা তরুণ এই নেতার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। অবস্থার চরম অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই স্বাধীনচেতা তরুণ। তাঁর এই আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতেই রাষ্ট্র এবার পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার আইনি উদ্যোগ নিল।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন