চা উৎপাদনে রেকর্ড, তবু বদলায়নি শ্রমিকের ভাগ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে চা উৎপাদনের ১৭১ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ উৎপাদনের নতুন রেকর্ড গড়েছে দেশের চা শিল্প। চা বোর্ডের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক মৌসুমে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ৯ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। তবে চা শিল্পের এই অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক অগ্রগতি ও রেকর্ড বুম হলেও, বাগানের মূল কারিগর অর্থাৎ চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি) সূত্র জানায়, এর আগে ২০১৮ সালের মৌসুমে দেশে চা উৎপাদন হয়েছিল ৮২ দশমিক ১৩ মিলিয়ন কেজি, যা তৎকালীন সময়ে সর্বোচ্চ ছিল। তারও আগে ২০১৬ সালে উৎপাদন হয়েছিল ৮৫ দশমিক শূন্য পাঁচ মিলিয়ন কেজি। প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে চা উৎপাদনের এই গ্রাফ কেবলই ওপরের দিকে উঠছে।
কিন্তু এই বিশাল সাফল্যের বিপরীতে শ্রমিকদের জীবনচিত্র অত্যন্ত করুণ। স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ জানান, হাড়ভাঙা খাটুনির পর একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মূল আয় হয় মাত্র ১৮৭ টাকা। এই যগণ্য আয়ে তাঁদের পর্যাপ্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যূনতম স্যানিটেশন ব্যবস্থাও জোটে না। অনেক শ্রমিক অবসরে গেলে বা কাজ করতে না পারলে মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁইটুকুও হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কিছু বাগানে শ্রমিকদের সচেতনতা রুখতে এবং সংগঠিত হতে না দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে মাদকের সহজলভ্যতা তৈরি করে রাখা হয়।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে চা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। এর মধ্যে নিবন্ধিত স্থায়ী শ্রমিক প্রায় ৯৮ হাজার এবং অনিয়মিত ক্যাজুয়াল শ্রমিক রয়েছেন আরও ৩০ হাজার। একজন শ্রমিকের সাপ্তাহিক বেতন গড়ে মাত্র ১৩০০ টাকার কাছাকাছি, যার সাথে সামান্য কিছু চাল বা আটা রেশন হিসেবে দেওয়া হয়। একটি বড় পরিবারে সাধারণত একজনই উপার্জনক্ষম হওয়ায়, ভাঙা ছোট ঘরে গবাদিপশু ও সন্তানদের নিয়ে অত্যন্ত গাদাগাদি করে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।
শিক্ষিত ছাত্র সমাজ ও যুব কল্যাণ পরিষদের প্রতিনিধিদের মতে, সুযোগ-সুবিধা মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। প্রবীণ বা বয়স্ক শ্রমিকরা চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। এত বছর ধরে এ দেশে বাস করলেও চা শ্রমিকদের জাতিগত পরিচয়, ভূমি অধিকার ও ভাষার স্বীকৃতি এখনো পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অবশ্য এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা সংসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চা শ্রমিকদের আবাসন ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন বাগান পর্যায়ে কাজ চলমান রয়েছে। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, নামমাত্র মজুরি আর রেশনের জোড়াতালির ব্যবস্থা দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়।
|