বিএডিসির ‘দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বীজ বর্ধন খামার প্রকল্প’: কৃষির নতুন শক্তি
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ
অনক আলী হোসেন শাহিদী: দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষিকে আরও টেকসই ও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে “বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বীজ বর্ধন খামার স্থাপন প্রকল্প”—যা দেশের অন্যতম বৃহৎ ও কৌশলগত কৃষি প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত।
প্রকল্পটির আওতায় সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ মৌজায় ৫৮৭.৮৪ একর বিস্তীর্ণ জমিতে গড়ে তোলা হবে আধুনিক বীজ বর্ধন খামার। এখানে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত উন্নত মৌল শ্রেণীর (Breeder Seed) ধান, আলু, ভুট্টা, ডাল এবং তেলজাতীয় ফসলের ভিত্তি শ্রেণীর (Foundation Seed) বীজ উৎপাদন করা হবে। উৎপাদিত এই বীজ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা হবে।
এই খামার থেকে উৎপাদিত গুণগত মানসম্পন্ন বীজ বিএডিসির সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দারিদ্র বিমোচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এই প্রকল্প হবে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
প্রকল্প এলাকায় সবুজ সার ও জৈব সারের ব্যবহার করে শস্যবিন্যাস (Cropping Pattern) এবং শস্য নিবিড়তা (Cropping Intensity) বৃদ্ধি করা হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিকূলতা সহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের মানসম্মত বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষিতে বৈচিত্র্য ও স্থিতিশীলতা আনা হবে। পর্যায়ক্রমে এক ফসলি জমিকে তিন ফসলিতে রূপান্তর করা হবে, যা এ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বাড়াবে।
খামারে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে চাষাবাদ, সেচ, সার প্রয়োগ ও বালাই ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। পাশাপাশি বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ কার্যক্রমে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যেখানে স্থানীয় নারী-পুরুষ উভয়ই অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে এলাকায় পাকা, হেরিংবোন ও কাঁচা সড়ক নির্মাণ করা হবে, যা উপজেলা ও জেলার সাথে যোগাযোগ সহজতর করবে। পুরাতন খাল পুনঃখনন এবং নতুন খাল খননের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে, যার সুফল আশেপাশের কৃষকরাও ভোগ করতে পারবেন।
এছাড়া পুকুর পুনঃখনন ও নতুন পুকুর খননের মাধ্যমে সেচের পানির রিজার্ভার তৈরি করা হবে এবং একই সাথে মৎস্য চাষের সুযোগ সৃষ্টি হবে। খালের উপর বক্স কালভার্ট এবং স্লুইস গেট নির্মাণের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা হবে। বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে পুরো এলাকায় আধুনিকায়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
প্রকল্পের আওতায় মাতৃবাগান ও উদ্যান ইউনিট স্থাপন করা হবে, যেখানে ফলজ ও সবজি ফসলের চারা ও কলম উৎপাদন করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে। কৃষক ও বীজ ডিলারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হবে, যা দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে সহায়ক হবে।
পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাপক বনায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। জোয়ারের পানি থেকে প্রকল্প এলাকা রক্ষায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যকর বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
এই খামারটি একটি বাস্তবভিত্তিক মাঠ প্রদর্শনী (Field Demonstration) হিসেবে কাজ করবে, যেখানে কৃষক ও কৃষি শিক্ষার্থীরা সরাসরি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। একই সাথে খামারে সবজি ও ফলের আবাদ স্থানীয় চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটি আধুনিক কৃষি, মৎস্য, ডেইরি ও পোল্ট্রি খাতকে সমন্বিত করে একটি বহুমাত্রিক কৃষি উন্নয়ন মডেল হিসেবে গড়ে উঠবে।
৪৭৮ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি থেকে ৩৮৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছেন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ সরোয়ার জাহান, যিনি ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সংশ্লিষ্ট সকল প্রকল্প পরিচালকদের সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তিনি নিজেও দিনরাত পরিশ্রম করে সকল প্রকল্পের সার্বিক তদারকি করছেন এবং প্রায়ই রাত ৯টা পর্যন্ত অফিস কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকেন। তার এই নিবিড় তদারকি ও দিকনির্দেশনার আওতায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই বীজ বর্ধন খামার প্রকল্পটিও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রয়েছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি সঞ্চার করেছে।
যদিও জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে, তবে বর্তমানে সেই জটিলতা নিরসন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে ক্ষতিপূরণ প্রদান সম্পন্ন হয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরের জুলাই থেকেই মূল কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ের গড় অগ্রগতির তুলনায় বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছে—যা প্রকল্প পরিচালকের আন্তরিকতা ও দক্ষতারই প্রতিফলন।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষে এই খামারটি বিএডিসির খামার বিভাগের অধীনে পরিচালিত হবে এবং ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন ও অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই বীজ বর্ধন খামার প্রকল্পটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে এক মাইলফলক হয়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, এই প্রকল্পটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। গুণগত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বর্তমান সরকার কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছে এবং এই বীজ বর্ধন খামার প্রকল্প সেই লক্ষ্য পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষকরা মানসম্মত বীজ সহজে পাবে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষি খাত আরও শক্তিশালী হবে।
|